Translate

Showing posts with label বুক রিভিউ. Show all posts
Showing posts with label বুক রিভিউ. Show all posts

Saturday, 29 November 2025

বিবিধ অভাব : লিওনার্দো লালন লাঁকা



‘চিত্রকলা, দর্শন, সংগীত, ভাষা, গ্রন্থপাঠ ও মঞ্চনাটক নিয়ে মোট ১৬টি প্রবন্ধের এক অনবদ্য সংকলন এটি। প্রত্যেক লেখাতেই পাঠক নতুন ভাবনার মুখোমুখি হবেন।’
ফ্ল্যাপের এই অংশে যে ‘নতুন ভাবনা’র মুখোমুখি হবার কথা বলা হচ্ছে পাঠকদের, তার সাথে খানিকটা পরিচিত হওয়ার বাসনা থেকেই মূলত বইটি পড়তে শুরু করি। পাঠশেষে সামষ্টিক উপলব্ধি কিম্বা জ্ঞানগত অভিজ্ঞতা (পরি)পূর্ণ হয়েছে এমন দাবি করছি না আপাতত। সেটা বুঝা যাবে এই লেখাটি পুরো পড়লে। তথাপি এই বইয়ের সাথে ‘অভাবী’দের পরিচয় করিয়ে দেওয়াটাই এই রচনার মূল উদ্দেশ্য।

চিত্রকলা চিন্তা : লিওনার্দোর চিতা—দৃষ্টির বিবর্তন

চিত্রকলা বিচারে চোখের ভূমিকা প্রধান। কোনো কিছু দেখতে দেখতে আমাদের মননে-মগজে নানা বোধের উদয় হয়, অবচেতনে; তৈরি হয় রুচি। এভাবেই আস্তে আস্তে আমাদের দেখার চোখ পাল্টে যেতে থাকে। কিন্তু কখনো কখনো আমাদের এই দৃষ্টি সংবেদনশীলতা (কালিক-স্থানিক প্রেক্ষাপটে) শিল্পকর্মের মূল ভাবনা-ভঙ্গিকে বুঝে উঠতে কিম্বা অন্যের কাছে মূর্ত করে তুলতে যথেষ্ট হয় না। এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজন হয় বিশেষজ্ঞ বা সমঝদার লোকের বিশ্লেষণমূলক দিকনির্দেশনার, যার মাধ্যমে আমাদের সাধারণ ‘চোখ’ থেকে সত্যিকারের ‘দেখা’র দৃষ্টি তৈরি হয়। এই সংকলনের চিত্রকলা বিষয়ক প্রবন্ধে লেখক নিজের সেই সমঝদারি বিশ্লেষণমূলক ভাবনাকেই পাঠকদের সাথে ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। বিশেষত, ‘দেয়ালে চাপা ভিঞ্চি : যুদ্ধে ছাপা শান্তি’ প্রবন্ধে  লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির আঁকা ‘দ্য বেটল অব অ্যাংগিয়ারি’  বা ‘অ্যাংগিয়ারির যুদ্ধ’ ফ্রেস্কো বা দেয়ালচিত্রটি নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে লেখক তুলে ধরেছেন যে, যুদ্ধবিরোধী ভিঞ্চি কিভাবে নিজের বিশ্বাস থেকে সরে না এসেও এই যুদ্ধভিত্তিক ফ্রেস্কোর কাজে হাত দিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে সেই কাজ ছেড়ে চলে যান—এই বিশ্বাস ও বাস্তবতার দ্বন্দ্বই হলো এই রচনার মূল বিষয়।

‘অভাবের ভাব : তিন পাগলের মেলা’র খবর

বইটির সবচেয়ে গভীর ও জটিল অংশ হলো এর দর্শন বিষয়ক প্রবন্ধগুলো। ‘অচিনদেশ : লালন, ফ্রয়েড ও লাকাঁ’ প্রবন্ধে লেখক জানাচ্ছেন—‘প্রাচ্যের দার্শনিক চিন্তার সাথে লালনের কথাকে পাশাপাশি রেখে পশ্চিমের চিন্তকদের চিন্তা ও ভাবনার পর্যবেক্ষণ করাই এই রচনার একমাত্র উদ্দেশ্য।’
লেখকের উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এসব বিষয়ে আমার যে চিন্তাগত অবস্থান; তার সাথে একটা বোঝাপড়া করার তাগিদ থেকেই মূলত পাঠ চালিয়ে নিয়ে যাওয়া।

লেখকের দাবি অনুযায়ী, লালনের ‘অচিন দেশ’ এবং ফ্রয়েড ও লাকাঁর ‘অচেতন’ তথা ‘ভাষা’ ও ‘ঈশ্বর বা ব্রহ্ম’—এসবের মধ্যে যে সাযুজ্য প্রথমে আবিষ্কার করেছিলেন সলিমুল্লাহ খান, এই প্রবন্ধে সেই আবিষ্কারকে পোক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে মাত্র। তবে এখানে একটি দ্বিমত জাগে—প্রাচ্যের চিন্তা চর্চার যে ঐতিহাসিক পরম্পরা; তার সাথে পাশ্চাত্যের আধুনিক চিন্তার সংশ্লেষ ঘটিয়ে পর্যালোচনাভিত্তিক যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন তিনি শেষ পর্যন্ত, সেটাকে আমার অসম্পূর্ণ বলে মনে হয়েছে। কেননা পাশ্চাত্যের যেসব দার্শনিক চিন্তা প্রাসঙ্গিকভাবে তিনি হাজির করেছেন তার লেখায়; বিপরীতে প্রাচ্যের ‘প্রতিনিধিত্বশীল’ কোনো দার্শনিক বা চিন্তকের এ বিষয়ক (অ)পরিপূর্ণ কোনো ভাবনার উপলব্ধিযোগ্য অস্তিত্ব আমরা পাই না। আদৌ কি? কে জানে!

এতদসত্বেও আমি (আমার পাঠকীয় সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়ে) স্বীকার করি, এখানে ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে যে বস্তুবাদী ধারণার একটা কাঠামোগত রূপ দিয়েছেন লেখক তার সাথে ঐক্যমত পোষণ করাটা আমার মতো পাঠকদের জন্য মোটেও সহজ ব্যাপার নয়। তারপরও, মাতৃভাষা বাংলায় দর্শনচর্চাকে গতিশীল করতে, একইসঙ্গে এবিষয়ে যুগে যুগে মানুষের যে চিন্তা-তৎপরতা; তার সাথে পাঠকদের কিঞ্চিৎ পরিচয় করিয়ে দিতে লেখকের এই প্রয়াস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করি।

এরপরে ‘পর ও পরম: লালন ও লাকাঁ’ প্রবন্ধে লালনের ‘আর আমারে মারিস নে মা’ গানটিকে উপলক্ষ করে লাকাঁর চিন্তায় ‘অপর’, ‘পর’ এবং ‘পরম’-এর সম্পর্কের দারুণ একটা প্রস্তাবনা হাজির করা হয়েছে। যেখানে লেখক ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন, কিভাবে ‘অভাবের ভাবে’র উৎপত্তি হয় এবং পরবর্তীতে সারা জীবনব্যাপী এর বিস্তার ‘সহজ মানুষ’কে তাড়িয়ে বেড়ায়। লেখক বলছেন—
পৃথিবীতে জন্ম মানেই বিশ্ব সংসারে, আকারের সাগরে সাঁতার কাটা শুরু, মানে অভাবের ভাব জেঁকে বসা আর নিরন্তর সেই অভাবের ভাব দূর করতে অবিরাম ছোটাছুটি, কখনো কখনো পরমের নিষেধ অমান্য, অতঃপর অপরের হাতে শাস্তি ভোগ এবং অবশেষে ‘আর আমারে মারিস নে মা/ বলি মা তোর চরণ ধরে ননী চুরি আর করবনা।’
সংগীত ও ভাষা : সম্প্রদায়ের সম্পর্ক

পার্থ সারথী গুপ্তের ‘বাংলায় সংগীত ও সম্প্রদায়বাদ’ লেখাটি নিঃসন্দেহে এই সংকলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এটি কেবল সংগীতের ইতিহাস নয়, বরং সংগীতের ধারার সঙ্গে কিভাবে সাম্প্রদায়িক ও সামাজিক বিভেদ বা ঐক্য জড়িয়ে আছে, সে বিষয়ে নতুন ভাবনা এনে দেয়।

‘গ্রন্থ ও মঞ্চনাটক : পাঠ প্রতিক্রিয়া’ পাঠের অভিজ্ঞতা

১.
পাঠ শুরু করেছিলাম বইটির শেষের দিক থেকেই। মূলত বিভিন্ন বই আর মঞ্চনাটকের প্রতিক্রিয়া হিসেবেই তৈরি করা হয়েছে এই অধ্যায়ের লেখাগুলো, যা বৃহত্তর মানবীয় আখ্যানের জন্ম, স্থায়িত্ব এবং ভাঙনের বিভিন্ন স্তরকে উন্মোচিত করে।

প্রথম লেখাটি আবুবকর সিদ্দিকের ‘প্রীতিময় স্মৃতিময়’ গ্রন্থটি পাঠের অভিজ্ঞতা নিয়ে। বইটি নিছক সাহিত্যিকদের ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ নয়, বরং এটি একটি সাংস্কৃতিক আখ্যানের সংরক্ষণাগার। এখানে স্বনামখ্যাত বারোজন কবি, সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিকের (যেমন: সত্যজিৎ রায়, বুদ্ধদেব বসু, বেগম সুফিয়া কামাল, শামসুর রাহমান, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস প্রমুখ) সঙ্গে লেখকের ব্যক্তিগত সাক্ষাৎ, পত্র চালাচালি ও স্মৃতির নমুনা হাজির করা হয়েছে।
এই আখ্যানগুলো প্রমাণ করে, কিভাবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা একটি সম্মিলিত সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে রূপান্তরিত হয়, যা অতীতে চলে যাওয়া ব্যক্তিত্বদের বর্তমান বাস্তবে বাঁচিয়ে রাখে।

পাঠপ্রতিক্রিয়ার শেষে তাঁর সাথে এই বইয়ের লেখকের ব্যক্তিগত স্মৃতির কথাও জানতে পারি।

২.
দ্বিতীয় পাঠপ্রতিক্রিয়া হাসান আজিজুল হকের আত্মজীবনীমূলক বই ‘ফিরে যাই ফিরে আসি’ নিয়ে।

লেখাটি শেষ হয়েছে লেখকের স্বাধীনতা বিষয়ক একটা অনুসিদ্ধান্ত দিয়ে। আত্মজীবনীতে একজন লেখকের স্মৃতির যে নির্যাস থাকে, সেটা কতটুকু সত্যাশ্রিত কিম্বা স্মৃতিভ্রমের প্রকোপ থেকে কতটা সুরক্ষিত অবস্থায় এই পর্যন্ত এসেছে তার সাথে একটা পাঠকীয় বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে এগিয়ে গেছেন লেখক। সে কারণে দেখতে পাই, হাসান আজিজুল হক এই বইয়ে যে স্মৃতিচারণ করেছেন; তাঁর জন্ম, শৈশব ও কৈশোরের আগ সময় পর্যন্ত সময়কে তিনি যেভাবে ধরেছেন গল্পের ঢংয়ে, ফিকশন আর নন-ফিকশনের যে ভেদরেখা; তাকে আবিষ্কার করতে গিয়ে রীতিমতো দ্বন্দ্বে পড়ে গিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন— স্মৃতি কি তবে এতটাই সৎ, অপ্রবঞ্চক থেকেছে ‘ভোরবেলাকার চোখে’ তে?

হাসান আজিজুল হক যে কালপর্বের স্মৃতি মন্থন করছেন এই বইয়ে, সেটা ঐতিহাসিক কারণে উপমহাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা সময়। একইসঙ্গে সেই সময়কার সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সংকটের চিত্রটাও তাঁর স্মৃতির অন্তর্গত। সেই হিসেবে তাঁর কৈশোরিক অভিজ্ঞতায় এই আত্মজীবনীতে অন্যান্য প্রান্তিক বিষয়ের মতো অবহেলিত না হয়ে বরঞ্চ অনেকটা অনিবার্যভাবে প্রতিফলিত হওয়ার কথা; ঐ চিত্রটা, অবচেতনে হলেও। কিন্তু তেমনটা হয়নি। এই দিক থেকে সম্ভবত লেখকের এমন প্রশ্ন তোলাটা অবান্তর নয়।

৩.
আহমদ ছফার উপন্যাস ‘একজন আলি কেনানের উত্থান পতন’-এর পাঠ প্রতিক্রিয়াটি একটু ভিন্নতর। মুক্তিযুদ্ধ ও তার পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের যে রাজনৈতিক তৎপরতা এবং তা নিয়ে আহমদ ছফার যে রাজনৈতিক ভাষ্য; তার একটা সংশ্লেষ আছে এই লেখাটিতে। একই পরিপ্রেক্ষিতে লেখা সলিমুল্লাহ খানের এবিষয়ক একখানা ভাবনাকেও হাজির করেছেন লেখক প্রসঙ্গক্রমে। বলা চলে বিস্তার ঘটিয়েছেন; যেখানে ছফার রাজনৈতিক ভাষ্য তুলে ধরে যে কিভাবে একটি বিপ্লবী বিশ্বাস দ্রুত ক্ষমতার রাজনীতি ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হাতে জিম্মি হয়ে একটি নতুন শাসক শ্রেণীতে পরিণত হতে পারে, যার মাঝে সলিমুল্লাহ খানের ভাবনাকে টেনে এনে লেখক দেখান যে বুদ্ধিজীবীরা কিভাবে আখ্যানের মাধ্যমে রাজনীতির এই বিবর্তনকে বাস্তবতার একটি নতুন সংজ্ঞা দিতে সচেষ্ট হন।

৪.
এই পাঠ প্রতিক্রিয়া থেকে জানতে পারি ‘নবারুণ ভট্টাচার্যের হারবার্ট উপন্যাস আদতে ইতিহাস ও রাজনীতিকে কবুল করে বলেছে দুটো কথা।’ যার মূল বক্তব্য হলো যে মানব সমাজ টিকে আছে সম্মতি এবং নিয়ন্ত্রণের উপর, যেখানে সমাজের একদল লোক তাদের আরাম ও স্থিতিশীলতার জন্য রাজনৈতিক চেতনার নিষ্ক্রিয়তাকে মেনে নেয়, যা শাসকদের জন্য সুবিধাজনক হয়। কিন্তু অন্যদিকে ‘বারুদ যেখানে জমবার সেখানে জমবেই...’ এই বক্তব্যটি মানব ইতিহাসের সেই অনিবার্য দ্বান্দ্বিকতা প্রকাশ করে, যখন কোনো কল্পিত ব্যবস্থা মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়, তখন সিস্টেম ভেঙে দিতে চাওয়া সেই বিদ্রোহী মনন অবশ্যই জেগে ওঠে, যা সামাজিক স্থিতাবস্থার বিবর্তনীয় ভঙ্গুরতাকেই নির্দেশ করে।

৫.
সলিমুল্লাহ খানের দু’টি বইয়ের আলোচনায় যুগপৎভাবে হাজির হয়েছে ইতিহাস পাঠের বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা; যা আমাদের একইসঙ্গে ইতিহাস পাঠের জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রণোদনা দেয়ার পাশাপাশি আবার তার বিনির্মাণের একটা প্রভাব বিস্তারি ধারার সাথেও পরিচয় করিয়ে দেয়।

আর ফ্রয়েডের ভাষাবিষয়ক ধারণাকে কাজে লাগিয়ে লাকাঁ ভাষার গঠনের যে বিমূর্ত জগতের সন্ধান দেন তাকে উন্মোচন করতে গিয়ে বা বলা ভালো আবিষ্কার করতে যেয়ে পরবর্তীতে সলিমুল্লাহ খান যে প্রস্তাবনা হাজির করেন; এই বইয়ে তারও একটা ধারণা পাই। যা সরাসরি জ্ঞানের বিবর্তন এবং বাস্তবতার প্রকৃতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কারণ ইতিহাসকে কেবল ঘটনার বিবরণ হিসেবে না দেখে, বরং এর বিনির্মাণ-এর একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার অর্থ হলো, আমরা সেই আখ্যানের স্তরবিন্যাস থেকে মুক্ত হতে চাই যা বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতার দ্বারা আরোপিত হয়েছে। এবং লাকাঁ ফ্রয়েডের ধারণাকে ব্যবহার করে দেখান যে ভাষা কেবল যোগাযোগ মাধ্যম নয়, এটিই আমাদের বাস্তবতার চূড়ান্ত কাঠামো, যা ইঙ্গিত করে যে মানুষ্যজাতি তার নিজস্ব তৈরি করা ভাষার বিমূর্ত জগতে বন্দী, যা তাদের চেতনা এবং পরিচয়কে নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে।

৬.
অনুপম হায়াতের বই ‘জহির রায়হানের চলচ্চিত্র : পটভূমি বিষয় ও বৈশিষ্ট্য’ নিয়ে এই নাতিদীর্ঘ আলোচনা থেকে জানতে পারি, চলচ্চিত্র নিয়ে জহির রায়হানের বহুমূখী তৎপরতা আর তাঁর এবিষয়ক নানা ভাবনার কথা। একইসঙ্গে একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে তাঁর কর্মকাণ্ডের ইতিবৃত্তও। বইটির পরিচিতিমূলক এই লেখাটিতে ধারাবাহিকভাবে উঠে এসেছে জহির রায়হানকে নিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, বিভিন্ন জনের স্মৃতিচারণে আর প্রতিবেদনে। যা প্রমাণ করে যে, চলচ্চিত্র কিভাবে একটি জাতির ঐতিহাসিক স্মৃতি ও রাজনৈতিক চেতনা নির্মাণে মৌলিক ভূমিকা রাখে।

এই সংকলনটি কেবল বিভিন্ন গ্রন্থ বা মঞ্চনাটকের প্রতিক্রিয়া নয়, বরং চিত্রকলা, দর্শন, স্মৃতি, রাজনীতি এবং ভাষার বহুস্তরিক ভাবনাগুলোর সাথে লেখক-পাঠকের ব্যক্তিগত বোঝাপড়ার যৌথ প্রচেষ্টা। বইয়ের কিছু কিছু বিষয়ের সাথে আমার পূর্বপরিচিতি ছিল। অল্প-বিস্তর পরিচয় ছিল আরো কিছু বিষয়ের সঙ্গে। কিন্তু অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েই আমি প্রথম জেনেছি এই বই থেকে। যা পরবর্তীকালে আমার চিন্তাচর্চায় ব্যাপক ভূমিকা রাখবে বলেই আমি আশা করি। বইটা পড়ার উদ্দেশ্যও ছিল সেটাই।

খসড়া/সেপ্টেম্বর/২০২০

বই সম্পর্কে~
নাম — বিবিধ অভাব : লিওনার্দো লালন লাঁকা
লেখক — বিধান রিবেরু
প্রচ্ছদ — ধ্রুব এষ
প্রকাশক — ঐতিহ্য
প্রচ্ছদ মূল্য — ২৬০৳

Tuesday, 14 May 2019

ইনতেজার হুসেইনের শ্রেষ্ঠগল্প


[১]
যে বইটা কিছুক্ষণ আগে শেষ করেছি, সেটা আরো অনেক আগে শেষ হবার কথা ছিল । কিন্তু শেষ হয় নি । মাঝে মাঝে পাঠ থামাতে হয়েছে আমার । আর সেটা সঙ্গত কারণেই । কারণটি উল্লেখ করবার আগে এই বই নিয়ে দু'টি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি । কেননা আমার পরবর্তী কথাগুলোর সাথে তাদের একট‍া সম্পর্ক আছে ।

প্রথমত, এই বইয়ের গল্পগুলো সহজপাচ্য নয় । যে কেউ এই গল্পগুলো পড়ে তৃপ্তি পাবে না । মোদ্দাকথা বাংলাদেশি পাঠকেরা যে ধরণের গল্প পড়তে অভ্যস্ত এই গল্পগ্রন্থের গল্পগুলো নানাদিক দিয়ে তার থেকে ভিন্নতর । দ্বিতীয়ত, এটি একটি অনুবাদ বই । অনুবাদক কর্তৃক অনূদিত হয়ে যে ভাষিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এইপর্যন্ত এসেছে; সেই পরিবর্তনটুকু বুঝে উঠবার মতো মননশীল পাঠচর্চা আমাদের দেশে গড়ে উঠেনি ।
উল্লেখ্য, এখানে মোটাদাগে মধ্যবিত্ত পাঠকদের কথা বলা হচ্ছে । 

এবার এই বই নিয়ে আমার পাঠবিষয়ক কিছু ধারণার কথা বলি । সঙ্গত কারণটি সম্ভবত তার মধ্যে নিহিত আছে ।

[২]
ইনতেজার হুসেইনের গল্পের বিষয়বস্তু অভিনব, বর্ণনাভঙ্গি অনেকটা সাধারণ হলেও তাঁর নির্মাণশৈলী বৈশিষ্ট্যপূর্ণ । তাঁর গল্প পড়ে প্রথমবারেই কেউ পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারবে কিনা কিম্বা আদৌ কারোপক্ষে পুরোপুরি বুঝে উঠা সম্ভব কিনা এমন প্রশ্নে কোনো পাঠকই হয়তো ইতিবাচক উত্তর দিতে পারবেন না । 

তাঁর গল্প বুঝে উঠাটা আসলেই কষ্টসাধ্য । এই বুঝে উঠাটাও আবার সময় সাপেক্ষ ব্যাপার । তাই কোনো পাঠক যদি এই দাবী করেন যে, তিনি প্রথম পাঠেই উম্মোচন করে ফেলেছেন ইনতেজার হুসেইনের গল্পজগৎকে ; এক্ষেত্রে আমাদের জন্য সেটা একরকম আশ্চর্যজনক ঘটনায় হবে! বলতে দ্বিধা নেই যে আমি নিজেও তাঁর সব গল্প বুঝিনি । এক পর্যায়ে এসে মনে হয়েছে গল্পগুলো বুঝে উঠার মতো প্রাপ্তমনস্ক হয়তো এখনো হইনি । 

তারপর হঠাৎ গল্পগুলোতে এমনভাবে ডুবে যায় যে; মনে হলো, যেন পুরোটা সময় জুড়ে কোনো এক অদৃশ্য শক্তি এক নাগাড়ে আমাকে দিয়ে গল্পগুলো পড়িয়ে নিয়েছে!

[৩]
দেশভাগের ফলে শিকড়চ্যুত মানুষের তীব্র যন্ত্রণা আর বেঁচে থাকার তীব্র আকুলতা ধরা পড়েছে 'ভারতের চিঠি' গল্পে। 
দেশভাগের ঘটনা এবং অভিজ্ঞতা একজন বাস্তুচ্যুত মানুষের মনে কিরূপ প্রভাব ফেলে এবং একইসাথে তার বিপর্যয়জনিত সমস্যাগুলো কেমন? তা অসাধারণ কুশলতায় তুলে ধরেছেন লেখক এই গল্পটিতে। 
আর দেশত্যাগের ফলে একজন মানুষ  শুধুমাত্র যে তার পৈতৃক এক খন্ড জমি হারায়, একটি বাড়ি হারায় তাই নয়, একইসাথে সে হারায় তার জন্ম-জন্মান্তরের স্মৃতি ও সম্পর্ক, হারায় পূর্বপুরুষদের পদচিহ্ন। 
গল্পটিতে এসব মর্মান্তিক যন্ত্রণার কথাই ফুটে উঠেছে লেখকের নিজস্ব গদ্যভঙ্গিতে । 

মানুষের জীবনের, চিন্তার বিপুল রহস্যময়তাকে এক অদ্ভুত জটিল প্রক্রিয়ায় উম্মোচন করেছেন লেখক 'হলুদ কুকুর' গল্পটিতে। গল্পের হলুদ কুকুরটির ধারণাগত কোনো ব্যাখ্যা কি আদৌ করা সম্ভব?  এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়াটা আমার মতো পাঠকের জন্য বিব্রতকর  বৈকি। তারপরও হলুদ কুকুর আমাদেরকে ভাবতে বাধ্য করে!

'সহযাত্রী' গল্পটির কেন্দ্রীয় চরিত্রটির কোনো নাম নেই । ভুল পথে ভ্রমন করতে থাকা নামহীন এই যাত্রীর সাথে পাঠক তার পথযাত্রার সঙ্গী হলেও শেষপর্যন্ত  ঐ যাত্রীর মতো পাঠকেরও কোনো স্টপেজে নামা সম্ভব হয় না । উদ্ভ্রান্ত ঐ যাত্রীর মতো আমরা পাঠকেরাও শুধু অবলোকন করতে থাকি সময়ের আবর্তে ঘু্র্ণায়মান সেইসব মানুষদের মুখচ্ছবি যারা একটা সময়কালকে নিজেদের সঙ্গে নিয়ে নানাভাবে পথভোলা মানুষের জীবনের অংশ হয়ে উঠে! 

'আফসোসের শহর' গল্পে ভুলে যাওয়া ইতিহাসের চেতনাগত অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে স্মৃতিচারণ করতে থাকা তিনজন মৃতের পারস্পরিক সংলাপ আমাদের ইতিহাসের অনেক অনুষঙ্গকে স্মরণ করিয়ে দেয় । 

'ঘুম' গল্পে যুদ্ধ ফেরত সৈনিকের জবানিতে যুদ্ধকালীন নির্দয় সময়ের পাঠ নিতে গিয়ে গল্পের চরিত্ররা ক্লান্ত-অবসাগ্রস্থ সৈনিকটির মুখে বিস্মৃতির কবলে পড়া যে ঘটনার কথা জানতে পারে তা শেষপর্যন্ত যে চেতনাহীন অভিজ্ঞতায় পর্যবসিত হয়েছে গল্পের শেষে এসে সেটা আবিষ্কার করতে আমাদের তেমন অসুবিধা হয় না ।

'শেষ মানুষ' ও 'কানা দাজ্জাল' গল্প দু'টিকে উন্মোচন করতে না পারার ব্যর্থতাকে আমি আমার পাঠসীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখার চেষ্টা করেছি । তারপরও এতসব বৈচিত্র্যপূর্ণ বিষয়ের যে অসামান্য সমন্বয় ঘটিয়েছেন লেখক এই দুই গল্পে, তা লেখকের স্বাতন্ত্র্যতা ও নিজস্ব প্রবণতা হিসেবে ধরে নিতে সমস্যা হয় না ।

[৪]
এই বইয়ের গল্পগুলোতে সব কথা বলে দেওয়া নেয়, অনেক বিষয়ই লেখক ছেড়ে দিয়েছেন পাঠকের জন্য । পাঠকভেদে যদিও এই বুঝায় তারতম্য ঘটবে । তারপরও পাঠশেষে গল্পের মৌলিক আবেদন শেষপর্যন্ত একই থাকবে বলে আশা করা যায় । বিশেষ করে যেখানে গল্পের বিষয়বস্তু হিসেবে উপস্থিত আছে দেশভাগ, স্বাধীনতা আর ধর্ম ও রাজনীতির রক্তাক্ত ইতিহাসের বহুমাত্রিক বয়ান ।

ইনতেজার যে ভাষা, সংলাপ ব্যবহার করে তাঁর গল্পগুলোকে হাজির করেছেন, তা আমাদের তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলোর প্রতি প্রচন্ড অাগ্রহী করে তুলে ; একইসাথে তিনি তাঁর গল্পে যে আবহ তৈরি করেছেন এবং যেভাবে প্রতীক, উপমা ও মিথের ব্যবহার করেছেন তা যুগপৎভাবে তাঁর সমস্ত সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে  আমাদের যথেষ্ট কৌতুহলী করে তুলে ।


বই সম্পর্কে ~
নাম - ইনতেজার হুসেইনের শ্রেষ্ঠগল্প
অনুবাদ - সালেহ ফুয়াদ
প্রচ্ছদ - ধ্রুব এষ
প্রকাশক - ঐতিহ্য
মূল্য - ১৫০ টাকা

Sunday, 12 May 2019

একটি শোক সংবাদ


সাব্বির জাদিদের গল্পগ্রন্থ 'একটি শোক সংবাদ' সম্প্রতি আমার এক নতুনতর পাঠ-অভিজ্ঞতা । বিষয়বস্তু সাপেক্ষে গ্রন্থভূক্ত প্রতিটি গল্পই ছিল চমকপ্রদ । এসব গল্পে জনজীবনের অচ্যুত দিকগুলি উম্মোচন করার পাশাপাশি লেখক আলো ফেলেছেন এর সাথে জড়িয়ে থাকা সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রচলিত সব নিয়ম-নীতি-রীতি-রেওয়াজের উপরও । যা পাঠকদের নিত্যনৈমত্তিক জীবন-পদ্ধতির বাইরে গিয়ে  নতুন করে ভাবতে শেখায় ।
গল্পগুলোর বৈশিষ্ট্যপূর্ণ কতক আখ্যান শুধুমাত্র এর ব্যতিক্রমধর্মীতার জন্য পাঠকের আলাদা মনোযোগের দাবিদার ।
একইসাথে কিছু গল্পের পরিণতি এতই নাটকীয় যে, প্রাপ্তমনস্ক পাঠকরা হয়তো কিছুটা দ্বিধান্বিতভাবে এর আকস্মিকতার কথা স্বীকার করবেন, কিন্তু সাধারণ পাঠকমাত্রই  সেইসব আকস্মিকতায় তীব্রভাবে আলোড়িত হবেন ।

গল্পপ্রসঙ্গে...
সাব্বির জাদিদের গল্পগুলোর ভাষা সহজ-সরল প্রাণবন্ত । তাঁর গল্পের নির্মাণশৈলী ও বর্ণনাভঙ্গি আকর্ষণীয় । যে কারণে গল্পগুলোর আঙ্গিকে, বিষয়ে বিচিত্রতা থাকলেও তা পাঠকের কাছে জটিলতর ঠেকে না ।
বইটা পড়া শুরু করেছিলাম শেষের দিক থেকে, সর্বশেষ গল্প 'পড়শি' দিয়ে ।
গল্পটি জীবনের সায়হ্নে এসে মূমুর্ষ অবস্থায় স্মৃতিচারণ করতে থাকা এক হতভাগ্য বৃদ্ধের । যে কিনা একদিকে পোড় খাওয়া জীবনের সর্বশেষ সংকটময় পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে থাকে, অন্যদিকে হন্যে হয়ে স্মৃতি হাতড়ে কি যেন খুঁজতে থাকে । এমন সময় হঠাৎ অাশ্চর্য হয়ে দেখি যে, তার মধ্যে ধর্মবোধ-ধর্মানুভূতি তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠছে । ফলস্বরূপ নাজুক পরিস্থিতিতে আমরা এমন সহায়-সম্বলহীন একজন বৃদ্ধকে দেখি, যে কিনা তার আত্মিক প্রশান্তিকে ত্বরান্বিত করছে এই ভেবে যে, সে মসজিদের পড়শি হওয়ার কারণে মৃত্যুকালে হলেও আল্লাহর কালাম শুনে যেতে প‍ারছে!
মানুষের জীবনে আধ্যাত্মিক ধ্যান-ধারণা কতোটা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্ট হিসেবে কাজ করে এবং এর মনস্তত্বাত্ত্বিক দিকটি যে কতোটা গভীর 'পড়শি' গল্পটি পড়ে তার কিছুটা হলেও অনুমান করা সম্ভব।

'জাতক ও জন্মভূমি' এবং 'যতিচিহ্ন' গল্প দু'টির পরিণিতি গ্রন্থভূক্ত বাকী গল্পগুলির পরিণতির চেয়ে ভিন্ন । সামনে ঠিক কি হবে সেটা আগে থেকে বুঝা না গেলেও এমনকি গল্পের কাহিনির প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ আলাদা হওয়া সত্ত্বেও গল্প দু'টির  পরিণতির আকস্মিকতার দিক দিয়ে কিছুটা মিল খুঁজে পাওয়া যায় । যেমন - 'জাতক ও জন্মভূমি' গল্পে পোয়াতি নাসরিনকে নিয়ে তার পরিবারের অস্থিরতা, পারিপার্শ্বিক সংকটময় অবস্থা ও সর্বোপরি রতনের মা'র আঁতুড়ঘরে অসফল হওয়াটার সাথে নবজাতকের জরায়ুর পর্দা খামচে ধরে থাকার সম্পর্কটা যেমন অলৌকিক ও আশ্চর্যজনক ছিল, ঠিক তেমনি ' যতিচিহ্ন' গল্পের নায়ক (নাকি খলনায়ক) বাদল ওরফে বদু তার সাম্প্রদায়িক বিশ্বাস-সংস্কার-ধারণা হেতু হঠাৎ  উদ্ভূত  এক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ধর্মালয়ে বিপুল প্রভাব-প্রতিপত্তি সাথে নিয়ে  যে তান্ডব চালায় তার সাথে শেষ মুহুর্তে পল্টু কর্তৃক প্রতিমা ভাঙার প্রাক্কালে বদুর চোখে সেই প্রতিমার মুখাবয়বে তার প্রেয়সী ফাতেমার মুখচ্ছবি ভেসে উঠাটা একই সাথে আমাদের জন্য সমান অলৌকিক ও আশ্চর্যজনক ছিল ।
লৌকিক-অলৌকিকতার এই সমান্তরালে চলাটা যেনবা আমাদের চোখের সামনেই!

'দূরত্ব' গল্পে দুইজন ঘনিষ্ঠবন্ধুর মাঝে তাদের মাদ্রাসার শিক্ষাজীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সংকীর্ণতার কারণে পরবর্তীতে যে শারীরিক ও মানসিক দূরত্ব সৃষ্টি হয়, তারই আখ্যান বর্ণিত হয়েছে ।  যে আখ্যানে রয়েছে ধর্মীয় মতে আপাত ভিন্নতা থাকার কারণে সৃষ্ট বৃহত্তর গোষ্ঠীভিত্তিক মতাদর্শিক নানাবিধ সমস্যার কথা । যেগুলো নিতান্তই  হাস্যকর !

'দোলায়িত জীবনের গান' ও ' একটি পুঁজিবাদী গল্প' তে প্রকাশ পেয়েছে যথাক্রমে নাগরিক জীবনের বিপুল রহস্যময়তা, প্রাত্যহিক জীবনের অনাহুত বিড়ম্বনা আর শ্রেণীবৈষম্যের কারণে সৃষ্টি হওয়া ভেদাভেদ এক রাখালের মনে কিভাবে বিরূপ প্রভাব ফেলে তারই ইতিবৃত্ত ।
'সূর্য না উঠা জনপদের গল্প' তে অসাধারণ ইঙ্গিময়তায় সামাজিক-রাষ্ট্রিক এক কঠিন সত্যকে রূপায়ণ করেছেন লেখক তাঁর অসামান্য গদ্যভঙ্গিতে ।
 পাঠককে তিনি নিয়ে গেছেন বিপর্যয়গ্রস্থ এক পৃথিবীতে । যে পৃথিবীতে স্বপ্নঘোরগ্রস্থ মানুষেরা তাদের এই সংকটমুখর ক্লান্ত জীবনকে পাশ কাটিয়ে অনিন্দ্য সুন্দর এক স্বাভাবিক-মানবিক জীবন যাপন করতে চান ।
 অদ্ভূত কোমল-মায়াময় এক অনুভূতি হয়েছিল 'যখন এসেছিলে' গল্পটি পড়ে । মন্ত্রমুগ্ধের মতো এক নাগাড়ে পড়ে শেষ করি পুরো গল্পটা । এই গল্প বাস্তবতাকে ছাপিয়ে লেখকের গভীর আখাঙ্ক্ষাকে মূর্ত করে তুলেছে প্রশ্নহীনভাবে!
এই বইয়ের অন্যসব গল্পের তুলনায় 'কুত্তা' গল্পটিকে অসম্পূর্ণ মনে হয়েছে । গল্পটিতে গ্লানিময় জীবনের একটা চিত্র পাওয়া যায় যদিও । তারপরও  পড়ে তৃপ্তি পাইনি ।

বইয়ের নামগল্প 'একটি শোক সংবাদ' নিয়ে আলাদা একটা আগ্রহ ছিল । গল্পটিতে লেখক অন্যচোখে নির্মাণ করেছেন মৃত্যুবিষয়ক ধারণাকে । যা পড়ে ক্ষণিকের জন্য বিষাদগ্রস্থ হয়ে পড়ি ।

শেষকথা...
সমাজবাস্তবতার পাশাপাশি মানুষের বিচিত্র সব মনোভঙ্গি বহুমাত্রিকভাবে চিত্রিত হয়েছে এই বইয়ের গল্পগুলোতে । যাতে ক্রমশ দৃশ্যমান হয়েছে নানাবিধ সমস্যা-জর্জরিত তৃতীয় বিশ্বের একটি ক্ষুদ্রতম দেশের অন্ত্যজ মানুষদের ভাগ্যাহত, যন্ত্রণাদগ্ধ তীব্র সংকটময় বিপন্ন সব মনোভূবনের করুণ প্রতিচ্ছবি ।


বই সম্পর্কে ~ 
নাম - একটি শোক সংবাদ
লেখক - সাব্বির জাদিদ
প্রচ্ছদ - কাজী জুবাইর মাহমুদ
প্রকাশক - ঐতিহ্য
মূল্য - ১৫০ টাকা

Thursday, 16 August 2018

কোলাহলে

এরপর তারা ঝড়ের মাঝে বেরিয়ে যেত । আমের ডাল ভেঙ্গে পড়ছে পথের ক্ষণে ক্ষণে আকাশ ডাকছে গুড়ুরগুড়ু, সুঁই সুঁই বৃষ্টি মাথায় নদীর পাড়ে গিয়ে পৌঁছুত তারা । মাইল মাইল লম্বা নদীর হুহু ফাঁকা পাড়, তীরের গাছপালা কাঁপছে আর করছে নাচানাচি ।
কামরুল ভাই নদীতি নামবা?
পাগলে ধরিসে? এন্নে নামলে পানিতি, টাইনে কুথায় নিয়ে চইলে যাবে আমাইগে জানিস?
নিলিই তো ভাল ।
'কোলাহলে'র ফ্ল্যাপের এই অংশটুকু রোমান্টিক একটি কাহিনির দিকে ইঙ্গিত করে । একইসাথে চরিত্রের সংলাপ ও পরিবেশ এর গ্রামীণ পটভূমিতে লেখার কথাও জানান দেয় আমাদের ।
কিন্তু পাঠ শেষে এই উপন্যাসের কাহিনিকে ঠিক রোমান্টিক বলা যায় না ।  যদিও কামরুল আর রোকেয়ার মধ্যে প্রেমঘটিত একটা সম্পর্ক ছিল ।
সেটা কি একপক্ষীয় প্রেম নাকি দ্বিপক্ষীয়?
 এমন একটা প্রশ্ন  যদিওবা থেকে যায় । তারপরেও শেষপর্যন্ত মীমাংসায় পৌঁছুতে পারি না ।
এছাড়াও বিচ্ছিন্নভাবে আরো কিছু রোমান্টিক চরিত্র আছে । উপন্যাসে সেগুলোর প্রত্যক্ষ কোন আবেদন না থাকলেও রোমান্টিক আবহ তৈরির ক্ষেত্রে এগুলোর পরোক্ষ কিছু অবদান আছে বৈকি ।

পুবপাড়া কে কেন্দ্র করে এই উপন্যাসের কাহিনির বিস্তার, যাতে গ্রামীণ জনজীবনের রূঢ বাস্তবতা, একইসাথে বৈচিত্র্যপূর্ণ সব চরিত্রের গ্রাম্য সরলতার বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ আর  একটি অযাচিত হত্যাকান্ডের রহস্য ক্রমশ উম্মোচিত হয়েছে পাঠকের সামনে ।

এই হত্যাকান্ডের রহস্যজট আরো ঘনীভূত হয় যখন চেয়ারম্যান আলাল শেখের শালা মনজু নিখোঁজ হয় । যার সাথে চেয়ারম্যান আলাল শেখ ও মনজুর স্ত্রী হালিমার গোপন সম্পর্কের একটা যোগসূত্র আছে ।
ঘটনার  ঘনঘটার সাথে মানবিক স্খলন আর মানুষের আদিম প্রবণতায় যে বহুমূখী উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল একসময়, একের পর এক ফ্ল্যাশব্যাকের কারণে সেটা অনেকটা স্তিমিত  হয়ে গিয়েছিল, আর একইসাথে কাহিনিও তার গতি হারিয়েছিল; পাঠের মাঝে তেমনটাই মনে হয়েছে আমার ।

এই উপন্যাসে কতোরকম বৈচিত্র্যপূর্ণ চরিত্রের সাথে যে দেখা হয়ছে গল্পের বাঁকে বাঁকে,তার কোন হিসেব নেয়।চরিত্র নির্ভর এই উপন্যাসে সেসব চরিত্রের জীবনচিত্র আলাদা আলাদাভাবে বিকাশের দাবি করলেও এর অন্তিম পরিণতি গল্পের মতো হওয়ায় তেমনটা করা সম্ভব হয়নি হয়তো । যার কারণে গলাকাটা লাশের রহস্যজট উপন্যাসের শেষে খুললেও সেসব চরিত্রের যাপিত জীবনের পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাঠ শেষে পাওয়া যায়নি ।  এক্ষেত্রে লেখকের স্বীকার্যটি গুরুত্বপূর্ণ । ভূমিকাতে তিনি বলেছেন- 'চরিত্রগুলো আরও একটু বিকাশের দাবিদার ছিল,উপন্যাসটির পটভূমি পুবপাড়াও চাইছিল তাকে আরও খানিক পরিষ্কার (ঘোলাটে?) করে তুলিনা কেন?'

গ্রামীণ পটভূমিতে লেখা এই উপন্যাসে গ্রাম্যতাকে লেখক যেভাবে চিত্রিত করেছেন, অর্থাৎ এই উপন্যাসের চরিত্র, ভাষা, সংলাপের ব্যবহার, আবহ ইত্যাদি সবকিছুই এই উপন্যাসকে বিশিষ্টতা দান করেছে ।
যদিও লেখক চাইলে উপন্যাসের চরিত্রদের জীবনবোধ নির্মাণে আরো বিস্তৃত গল্পকে ধারণ করতে  পারতেন । তাঁর গ্রাম্য জীবনবীক্ষণকে, সমাজবীক্ষণকে আরো স্পষ্ট, আরো অর্থবহ এবং আরো তাৎপর্যপূর্ণ করতে পারতেন!

বই সম্পর্কে~
নাম-কোলাহলে
লেখক-এনামুল রেজা
প্রচ্ছদ-শতাব্দী জাহিদ
প্রকাশক-আদী প্রকাশন
মূল্য-২০০ টাকা

Sunday, 8 July 2018

বর্ষামঞ্জরি

এই উপন্যাস যখন পড়তে শুরু করি, তখন প্রকৃতি কেমন ছিল?

'বর্ষামঞ্জরি' পড়তে শুরু করি বৃষ্টিমুখর বিষণ্ন এক বিকেলে ।

শুধুমাত্র একটি উপন্যাস পাঠে প্রকৃতির  মলিন-বিষাদগ্রস্থ এমন একটি দিনও যে এতোটা মায়াময় আর স্নিগ্ধ হয়ে উঠতে পারে, মুগ্ধতা আর পার্থিব আচ্ছন্নতার মিশেলে কোমল একটি পরিবেশের  সৃষ্টি করতে পারে, সেটা ভেবে অবাক হয়েছি  । মন্ত্রমুগ্ধের মতো একনাগাড়ে পুরোটা পড়ে শেষ করেছি ।

প্রচ্ছদপাঠের প্রতিক্রিয়া কী?

বইটি হাতে নেওয়ার পর প্রচ্ছদেই চোখ আটকে গিয়েছিল।নারীমূর্তি,ধনুর্বিদ,মৎস্য আর সাথে বেলী ফুলের ছবি।এগুলো দেখে প্রথমে কোন কূল-কিনারা করতে পারিনি!

মহাভারতের অর্জুনের কথা মনে পড়ে হঠাৎ ।
দ্রৌপদীর স্বয়ংবর অনুষ্ঠানে সন্ন্যাসী অর্জুনের লক্ষভ্যেদী তীর নিমেষেই যখন মৎস্যের চক্ষুকে ভেদ করে চলে যায়,চারদিক থেকে তখন হরেক রকমের ফুলের বর্ষণ শুরু হয়।নানা বর্ণের,নানা গন্ধের সেইসব ফুলের মধ্যে হয়তো বেলী ফুলও ছিল! কে জানে...

প্রচ্ছদ পড়ে এমনটি-ই মনে হয়েছিল প্রথমে,এমনকি পৌরাণিক কাহিনীর চরিত্রগুলিকে জীবন্তও মনে হয়েছিল! যেনবা চোখের সামনেই।আর উপর থেকে যে বেলী ফুলের বর্ষণ।থোকা থোকা বেলী ফুল।আহা! বুঝিবা রাজকুমারী বর্ষাঞ্জলির স্বয়ংবর অনুষ্ঠানের সেই অলৌকিক বর্ষণ।

আমি কেমন পাঠক?

আমি গল্প বলতে ভালবাসি।শুনতেও ভালবাসি।যখন কোন বই পড়ি, তখন কখনো গল্প বলিয়ে রূপে কিম্বা কখনো কখনো একজন নির্বাক শ্রোতা রূপে গল্পের চরিত্রদের মাঝে নিজেকে আবিষ্কার করার চেষ্টা করি।

উপন্যাসের কাহিনীটা কিরকম?
এবং এর মাঝামাঝি এসে কি মনে হয়েছিল?

একজন গল্পকথক।যে কিনা কোনোরকম স্বার্থ ও উদ্দেশ্য ছাড়াই গ্রামে-গঞ্জে,শহরে-মফস্বলে ঘুরে ঘুরে লোকদের শুধু গল্প শোনায়।হরেক রকম গল্প।পাওয়া আর না পাওয়ার গল্প,বলা আর না বলার গল্প।যে গল্পে মূর্ত হয়ে আমাদের নাগরিক জীবনের সফলতা আর ব্যর্থতার ইতিবৃত্ত।একই সাথে ব্যক্তি থেকে শুরু করে সামাজিক-রাজনৈতিক রাষ্ট্রীয় বিষয়াবলিও।

গল্পের আসরে এই গল্পকথকের সাথে তার শ্রোতারাও আবার সমান গুরুত্বপূর্ণ।সবাই মুক্ত-মতামত জানিয়ে নিজেরদেরকে আরো গল্পের সাথে জুড়ে দিতে চাই।সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য।বিচিত্র সব মানুষের সেইসব বৈচিত্র্যপূর্ণ মন্তব্য যেনবা বহুচিন্তার মানুষদের চিন্তাগত সহাবস্থানের এক অলৌকিক ইঙ্গিত! বুঝিবা সমাজের সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের শিকড়ের গভীরতার পরিমাপ! যার অন্তিম পরিণতি গল্পকথকের হাতেই লেখা হয়।

উপন্যাসের পরিণতি নিয়ে আগ্রহ কেমন ছিল?
কোন বিষয়টি আমার কাছে আশ্চর্যজনক মনে হয়েছে?

গল্পকথকের গল্পই আমার আকার্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল,অন্তত গল্পের শেষের সেই করুণ অথচ ঘোরলাগা সময়ের চিত্র অবলোকন করার আগমূহুর্ত পর্যন্ত। স্বয়ংবর অনুষ্ঠানের বিচিত্র সব মানুষের সমাগমে  রাজকুমারী বর্ষাঞ্জলির সেই মহৎ প্রাণের চিকিৎসকের গলায় মালা পরানোর সম্ভাব্য পরিণতি যতটা না কাঙ্খিত ছিল,গল্পকথকের উপস্থিতি তার চেয়েও বেশি চমকপ্রদ ছিল,সেই অলৌকিক ঘটনার জন্যে নয়,বরং শেষ মূহুর্তে গিয়ে গল্পকথকের নিজেই নিজের গল্পের চরিত্র হয়ে উঠার জন্য।

লেখকের লেখার সাথে আমার বোঝাপড়া কেমন?

লেখকের এই জাদুবিস্তারি গদ্যভঙ্গির সাথে আমার পরিচয় হয় দুই-তিন বছর আগে । তাঁর উপন্যাস 'অন্য কোথাও অন্য কোনখানে'র মধ্য দিয়ে । সেই যে মোহগ্রস্থ হয়েছি, এখনো সেই মোহ কাটে নি ।  দিন দিন সেটা বেড়েই চলেছে ।

পাঠ শেষে তীব্র আবেগের সাথে 'বর্ষামঞ্জরি' কে জড়িয়ে ধরি। যেন সমস্ত ভালোলাগা ক্ষনিকের জন্য হলেও একাকার হয়ে যায় । আর ঘোরগ্রস্থের মতো ভাবতে থাকি, এ কেমন উপন্যাস?

কিন্তু ভাবনা শেষ হয় না ।
এই ভাবনা শেষ হওয়ার নয় । কারণ এই ভাবনা যে অসীম!

আর একে পাড়ি দেওয়ার ক্ষমতা কি আদৌ আমার আছে...

আর কিছু বলার আছে?

হুম,আছে ।
আমি মনে করি, কেউ যদি বাংলাদেশকে জানতে চাই, এদেশের মানুষকে জানতে চাই; তাহলে তার এই উপন্যাস পড়া উচিৎ!

পুনশ্চ - এটি এই  উপন্যাসের সামগ্রিক মূল্যায়ন নয় ।


বই সম্পর্কে~
নাম-বর্ষামঞ্জরি
লেখক-আহমাদ মোস্তফা কামাল
প্রচ্ছদ-শাহীনুর রহমান
প্রকাশক-শুদ্ধস্বর
মূল্য- ১৮০ টাকা

                      

Friday, 25 May 2018

উপন্যাসের পথে

এই বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায়টিই তুলনামূলকভাবে ভালো লেগেছে প্রথম অধ্যায়ের চেয়ে।পুরো বইটি এই দুই আধ্যায়েই লেখা যদিও।

রাতারাতি বিখ্যাত ঔপন্যাসিক বনতে চাওয়া একজন তরুণের ক্রমশ পরিণত ঔপন্যাসিক হওয়ার অভিজ্ঞতা আর তার শৈল্পিক প্রক্রিয়ার প্রাণবন্ত আলোচনাই এই অধ্যায়ের প্রতিপাদ্য বিষয়। সংলাপের আইডিয়াটা যদিও চমৎকার।কিন্তু মাঝে মাঝে সেটাকে আদিখ্যেতাই মনে হয়েছে আমার। তবে লেখকের জন্য বিষয়টি হয়তো গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

লেখকদের লেখালেখির প্রক্রিয়া নিয়ে আমাদের, পাঠকদের মধ্যে একটা কৌতূহল কাজ করে সবসময়। এই কৌতূহল যদিও বেশিরভাগ সময় কৌতূহলই থেকে যায়। তারপরও লেখকদের এই ধরণের মুক্ত্যগদ্যের বই কখনো-সখনো সেইসব কৌতূহল উপশমকারী হিসেবে কাজ করে বৈকি।

'উপন্যাসের পথে' আমার পড়া স্বকৃত নোমানের দ্বিতীয় বই।এর আগে তার একটা উপন্যাস পড়েছিলাম।
'ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল হুমায়ূন আহমেদ তরুণ সাহিত্যিক পুরষ্কার' এবং 'এক্সিম ব্যাংক-অন্যদিন তরুণ সাহিত্য পুরষ্কার' প্রাপ্ত উপন্যাস 'কালকেউটের সুখ'।

যাইহোক, এর আগে এই ধারার আরো  একটি  বই পড়েছিলাম। প্রিয় লেখক আহমাদ মোস্তফা কামালের মুক্তগদ্যের বই 'একদিন সবকিছু গল্প হয়ে যায়'। উভয়টিই লেখালেখি বিষয়ক মুক্তগদ্যের বই হলেও বই দুইটির আঙ্গিক আর গদ্যভঙ্গি সম্পূর্ণ আলাদা।

লেখকের সাহিত্যচর্চার সামগ্রিক একটা তথ্যচিত্র পেয়েছি এই বইয়ে। লেখক তার প্রথম উপন্যাস 'নাভি' কে নিয়ে দীর্ঘ স্মৃতিচারণ করেছেন। সেই উপন্যাসের পরিপ্রেক্ষিত সাপেক্ষে লেখকের এইসব বয়ান খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের একটি সংবাদের শিরোনাম থেকে কিভাবে 'এইচএসবিসি-কালি ও কলম' পুরষ্কারপ্রাপ্ত উপন্যাস 'রাজনটী'র জন্ম হয় ; তার ইতিবৃত্ত পড়ে যারপরনাই অবাক হয়েছি।

নির্যাতিত-নিপীড়িত রোহিঙ্গা জাতিকে নিয়ে লেখা উপন্যাস 'বেগানা'র রচনার নেপথ্য কাহিনীও বেশ চমকপ্রদ।
এরপর ধারাবাহিকভাবে এসেছে শমসের গাজীকে নিয়ে তাঁর উপন্যাস 'হীরকডানা'র কথা। ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গিতে রচিত ইতিহাসে অসততার যে ধারা, তার থেকে বেরিয়ে এসে, বিস্মৃত হতে থাকা একজন বীরের জীবনের ইতিবৃত্তকে ক্রমান্বয়ে সত্য ইতিহাসের নির্যাস আর কল্পনার মিশেলে উপন্যাসে রূপান্তর করার অভিজ্ঞতার কথা বিবৃত হয়েছে।
তাঁর গল্পগ্রন্থ 'নিশিরঙ্গিনী' এবং 'বালিহাঁসের ডাক' এর গল্পগুলোর আলোচনায় প্রসঙ্গিকভাবে উঠে এসেছে একজন গল্পকারের গল্পভাবনা, একইসাথে মূর্ত হয়ে উঠেছে সেগুলোর গল্প হয়ে উঠা-না হয়ে উঠার ব্যাপারে  তাঁর লেখকসুলভ দ্বিধামিশ্রিত সময়ের চিত্র।
সর্বশেষ উপন্যাস 'শেষ জাহাজের আদমেরা'র রচনার প্রেক্ষাপট এবং তার সাথে ঔপন্যাসিকের  ইতিহাস ও শিল্পের যে  বিন্দুকে স্পর্শ করার আকাঙ্খার কথা ব্যক্ত করা হয়েছে বইয়ের শেষের দিকে, সেটি স্পর্শ করতে পেরেছেন কিনা? তা নির্ণয়ের দায়িত্ব,একইসঙ্গে উপন্যাসটি লেখার সার্থকতা নিরূপনের ভার যথারীতি পাঠকের উপরই ন্যাস্ত করা হয়েছে।

মোটের উপর একটি উপন্যাস রচনা করতে গিয়ে একজন ঔপন্যাসিকের যে শৈল্পিক প্রচেষ্টা, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের যে খাটুনি একই সাথে বিষয়ভিত্তিক পাঠ নেওয়া এবং তার শিল্পসঙ্গত ব্যাবহারের নান্দনিক অভিযাত্রা, এই বই পাঠান্তে তার একটা সামগ্রিক ধারণা পেয়েছি।

এই বইয়ের কি কোন সমালোচনা করা যায়?
লেখকের এই বই লেখার উদ্দেশ্য সাপেক্ষে এবং সর্বোপরি বইটির একজন মুগ্ধ পাঠক হিসেবে বলছি-না। কারণ ঔপন্যাসিকের জীবনধারা ও উপন্যাস বিষয়ে এই বইটিতে অন্তর্ভুক্ত লেখাগুলির উপর আগামী দিনে স্থির না থাকতে পারার (আপাত) একটি শঙ্কার কথা লেখক আমাদের জানিয়েছেন।একজন পাঠক হিসেবে যার প্রভাব আমার উপরও অল্প-বিস্তর কার্যকর।
কে জানে? একদিন হয়তো আমি নিজেই আমার এই মুগ্ধতার উপর স্থির থাকবো না!
তাই সমালোচনা নয়,শুধুমাত্র মুগ্ধতার কথাগুলি তোলা থাকুক।

পুনশ্চ-১
বইটির প্রথম অধ্যায়ের 'আরোপিত' ভঙ্গির কথাগুলো আমার তেমন ভাল লাগে নি। বিশ্বাসী বলেই হয়তো এমনটা হয়েছে!

পুনশ্চ-২
(লেখকের বাড়তি পাওয়া হিসেবে) এই কথাগুলো একদিন আমার কাজে আসবে। অদূরভবিষ্যতে হয়তো আরো অনেকেরই আসবে।
পাঠশেষে এই-ই প্রাপ্তি!

বই সম্পর্কে~
নাম- উপন্যাসের পথে
লেখক-স্বকৃত নোমান
প্রচ্ছদ-শতাব্দী জাহিদ
প্রকাশক-আলোঘর প্রকাশনা
মূল্য-২০০ টাকা



Saturday, 5 May 2018

মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে ইসলাম

বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার যে বীজ রোপিত হয়েছিল বাঙালির চিন্তায় চেতনায়;মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে একসময় সেটি মহীরুহে পরিণত হয়।যার শিকড় আজও প্রতিটি বাঙালির চেতনার গভীরে প্রোথিত।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রশ্নে বর্তমান তরুণ প্রজন্মকে একধরণের হিস্ট্রিক্যাল ডিসেপশনের শিকার হতে হয়।কারণ আমাদের দেশে এখন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চার যে ধারা পরিলক্ষিত হয়,তা অনেকটা রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে সেক্যুলারপন্থীদের আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত।
ইতিপূর্বে যারা ইতিহাস রচনা করেছেন তাদের অধিকাংশই দলগত আদর্শিক দ্বন্দ্বের কারণে মুক্তিযুদ্ধের বয়ানকে 'ধর্মনিরপেক্ষতা'র মুখোশ পরিয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছেন।

বাস্তবতা বিবর্তিত-বিবর্জিত এই ইতিহাস রচনার ধারার বিপরীতে দাঁড়িয়ে ইতিহাস রচনার উপাদান সমূহকে নতুন এঙ্গেল থেকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে সেগুলোকে নিরপেক্ষভাবে উপস্থাপন করাটা বাস্তবিক পক্ষে শুধু সময়ের দাবি ছিল না বরং কালিক প্রেক্ষাপটে এর প্রয়োজনীয়তা অনিবার্যভাবে অনেক আগে থেকেই ছিল।কিন্তু মতাদর্শিক সংকীর্ণতা থেকে দূরে সরে,স্বত্বাগত হিংসা-দ্বেষ থেকে বেরিয়ে এসে বাম-সেক্যুলারপন্থীদের নৈতিক অবস্থান থেকে ইতিহাস রচনা করাটা আদতে কখনোই সম্ভব হয়নি।

এমন সময়ে তথ্য,তত্ত্ব ও সত্যের অপূর্ব সমন্বয়ে দালিলিক ইতিহাস রচনা করেছেন বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় লেখক পিনাকী ভট্টাচার্য।বিষয়বস্তুর দিক থেকে তার বই "মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে ইসলাম" সামগ্রিকভাবে সেই ইঙ্গিতই বহন করে।

বইটিতে লেখক "বয়ান" শব্দটিকে চিন্তার কন্সট্রাকশন বা চিন্তা-কাঠামো অর্থে ব্যবহার করেছেন।আমাদের দেশে ইতিহাস রচনার যে ঐতিহ্য,ইতিহাসবিদদের চিন্তার যে বৈচিত্র ও বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হয়,ইসলামের প্রশ্নে পর্যালোচনার ভিত্তিতে মুক্তিযুদ্ধের সর্বজনগ্রাহ্য দলিল সমূহ থেকে সেগুলোকে তুলে এনে তাদের মাঝে সাদৃশ্যতা অনুসন্ধানে লেখকের যে প্রয়াস;কাঠামোবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে সেটিকে যথার্থই মনে হয়।

"মুক্তিযুদ্ধ নির্মাণের বয়ান-বক্তৃতায় ইসলাম" প্রসঙ্গে বইটির দ্বিতীয় অধ্যায়ে উপস্থাপিত দালিলিক পর্যালোচনা থেকে বুঝা যায়,মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রেরণা হিসেবে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইসলামের অবস্থান কিরকম ছিল এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে তৎকালীন সচেতন আলেম সমাজের ভূমিকা কেমন ছিল।অধ্যায়ের শেষে  কওমি ধারার আলেমদের যে অংশটি মুক্তিযুদ্ধকালীন নীরব ভূমিকা পালন করেছিল তাদের ব্যাপারেও একটা স্পেসিফিক ধারণা পাওয়া যায়।

বইটির পঞ্চম অধ্যায়ে "মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীতাকারীদের বুঝাতে ইসলামের প্রতীক ও চিহ্নের বিকৃত উপস্থাপন" নিয়ে যে পর্যালোচনা করা হয়েছে তাতে দু'টি বিষয় স্পষ্ট হয়।

এক. যে ইসলামপন্থি দলটি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতায় মূখ্য ভূমিকা পালন করেছিল,তার দায়ভার পরবর্তীতে অন্যান্য ইসলামপন্থিদের উপর চাপিয়ে দেওয়ার যে প্রবণতা সেক্যুলারপন্থীদের মাঝে দেখা যায় সেটা কতটা যৌক্তিক।
দুই. মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীপক্ষের লোক মাত্রই দাড়ি-টুপি ওয়ালা মানুষ;এটা বুঝাতে ইসলামি চিহ্ন সমূহকে প্রতীকায়িতভাবে যত্রতত্র এর বিকৃত উপস্থাপনের ক্ষেত্রে তাদের যে মানসিক অবস্থান সেটা কতটা নৈতিক।
এই অধ্যায় পাঠে এসব প্রশ্নের কিছু দালিলিক উত্তর মিলতে পারে।

বর্তমানে আমাদের দেশের সংবিধানে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের যে উল্লেখ রয়েছে,মূলনীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনার সাপেক্ষে এর প্রাসঙ্গিকতা কতটুকু ছিল।ধর্মনিরপেক্ষতাবাদকে মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করার  আবশ্যিকতা কিংবা যৌক্তিক অনিবার্যতা মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কেমন ছিল।পরবর্তীতে সেটিকে মূলনীতি  হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারত কিভাবে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করেছিল;বইটির সপ্তম অধ্যায়ে তার একটি ঐতিহাসিক পর্যালোচনা করা হয়েছে।যা নিঃসন্দেহে যুগপৎভাবে এ বিষয়ে ইতিহাসের ভিন্ন পাঠ নিতে এবং অগ্রসর পাঠকদের চিন্তার খোরাক যোগাতে সাহায্য করবে।

পরিশেষে বইটি সামগ্রিকভাবে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক বাস্তবতা উপলব্ধির নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করি...

(মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে ইসলাম-পিনাকী ভট্টাচার্য,গার্ডিয়ান পাবলিকেশন্স)


Sunday, 25 March 2018

জলপাই রঙের কোট

মুক্তিযুদ্ধের একটি ঘটনার প্রত্যক্ষ বর্ণনা দিয়ে উপন্যাসের শুরু।
যে ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়,মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ঘটে যাওয়া বাঙালিদের অনেক গোপন অথচ বীরত্বপূর্ণ কাহিনীর কথা।

যাতে আছে রজব আলীর মতো কাপুরুষ বিশ্বাসঘাতকদের নিজের দেশের সাথে বেইমানী করার অকপট বর্ণনা।অার রফিক,ইয়াসিন,ফজলদের মতো দেশপ্রেমিক মুক্তিযুদ্ধাদের বীরত্বের অপূর্ব সব কাহিনী।
তারপর থেকে ফ্ল্যাশব্যাক দিয়ে দিয়ে এগিয়ে চলে উপন্যাসের কাহিনী।
বাঙালির ইতিহাসের সোনালি সব অধ্যায়ের বর্ণনা মূর্ত হয়ে উঠে  একজন হতভাগা মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতিচারণে।
আর গ্রামের মেটোপথে মুক্তিযুদ্ধের গল্প খুঁজতে যাওয়া একদল তরুণ মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতে থাকে সেসব যুদ্ধদিনের কথা।

আমরা আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করি,লেখকের মেদহীন গদ্যে জীবন্ত হয়ে উঠে মুক্তিযুদ্ধকালে  সুবীরময় সেনের মতো সংখ্যালঘুদের উপর ইউসুফ সাহেবদের মানসিক নির্যাতনের অকথ্য সব দৃশ্যপটের করুণ বর্ণনা।
রেনুকার মতো নিঃসন্তান গৃহবধূদের সামাজিকভাবে নিগ্রহীত হওয়ার;আত্মগ্লানি নিয়ে স্বামীর বুকে মুখ লুকানোর গোপন সব না বলা গল্পের কথা।

সুবীরময় সেনের স্ত্রী বিমলার মতো অনেক নারীর স্বামীর পথ চেয়ে আপেক্ষা করার অজানা সব গল্প।লেখকের দৃশ্যকল্পে চিত্রটি ধরা পরে এভাবে-
তবু মনের ভেতর নিভু নিভু করে জ্বলে উঠে দ্বীপটি।একদিন আঁধার ক্ষয়ে ক্ষয়ে নামবে ভোর।টকটকে একটা সূর্য দেখা দেবে পুবের আকাশে।সেই সূর্যকিরণ ছড়িয়ে পড়বে চারিপাশে।বিমলা তাই আশায় বুক বাঁধেন।

আছে তার কন্যা দীপার মতো মেয়েদের অনেক গল্পকথা।যেখানে আছে একটি মেয়ের মনে স্বপ্নের পুরুষকে নিয়ে তিলে তিলে গড়ে উঠা সম্ভাবনাময় প্রেমের অসংখ্য উপাখ্যানপর্ব।
সেই সম্ভাব্য প্রেমের সম্ভাব্য পরিণতিকে লেখক চিত্রায়িত করেছেন তার সজীব-নির্বিকল্প গদ্যশৈলীর মাধ্যমে-
ডুবতে ডুবতেও দীপার চোখজুড়ে নেচে বেড়ায় অজানা স্বপ্ন এক।থেকে থেকে দুলে দুলে উঠে।হাওয়া লাগে নিভে যায়।নিভে যায় হাওয়া লাগে।ফুল ফুটে ফুল ঝরে।তবুও প্রতীক্ষা জীবনের।আশ্চর্য মানুষের এই টিকে থাকার লড়াই।
বলাই বাহুল্য পুরো উপন্যাসে আংকেলের ভূমিকায় যিনি আমাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনিয়েছেন;তিনি আর কেউ নন।উপন্যাসের কেন্দ্রিয় চরিত্র,হতভাগা মুক্তিযোদ্ধা সুজিত।সুজিত বড়ুয়া।
যে কিনা একদিন দেশকে ভালবেসে,দেশের জন্যে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।কোন ধরণের প্রাপ্তির আশা ছেড়েই।
কিন্তু কখনো কখনো তার নিজের কাছে মনে হয়,মুক্তিযুদ্ধোত্তর সময়ে একটি কোট ছাড়া প্রাপ্তি হিসেবে তিনি কিছুই পান নি! তখন আপন মনে বলে উঠেন যেটা পেয়েছি সেটাই বা কম কিসের!
পাকা জলপাই রং সেই কোটের।মাঝে মাঝে যখন হতাশা বেড়ে যায়,তখন তিনি এই জলপাই রঙের কোট গায়ে হেঁটে বেড়ান পাড়ার মধ্যে।
যেটি যুদ্ধের সময় একজন পাকিস্তানি অফিসারের শরীর থেকে খুলে নিয়েছিলেন তিনি।
কোটটি গায়ে ছড়ালেই অন্যরকম একটি ভালো লাগা কাজ করে তার মধ্যে।বুকের ছাতি ফুলে উঠে তার!

"জলপাই রঙের  কোট" উপন্যাসে চট্টগ্রামের গৈরালা গ্রামের প্রেক্ষাপটে লেখক তুলে ধরেছেন সারা দেশে রক্তপিপাসু হানাদার বাহিনীদের  অবর্ণনীয় নির্যাতনের চিত্র।
একই সাথে মুক্তিযোদ্ধার প্রত্যক্ষ বয়ানে উঠে আসে একাত্তরের সেইসব বীরত্বপূর্ণ আখ্যানের কথা;যেখানে ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ একটি মাত্র পতাকার নিচে সমবেত হয়েছিল,
একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে।

উপন্যাসের লেখকের ভাষারীতি,গদ্যশৈলী প্রাণবন্ত।যার কারণে ঐতিহাসিক উপন্যাস হওয়া সত্ত্বেও পাঠকের কাছে বিরক্তিকর লাগবে না।
তবে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা ব্যাবহার করার ক্ষেত্রে লেখক তেমন সাবলীল নন।তাছাড়া আঙ্গিক বিচারে আখ্যান বর্ণনায় লেখকের যে প্রয়াস;তা পাঠকের মনযোগ রক্ষা করতে কতটুকু সামর্থ্য হবে?
এমন একটা প্রশ্নও শেষপর্যন্ত থেকে যায়।

বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লেখা "জলপাই রঙের  কোট" উপন্যাসটি একটি দালিলিক উপন্যাস হিসেবে আমাদের বাংলা সাহিত্যে জায়গা করে নিবে।পরিশেষে একথা বলতেই পারি।

(জলপাই রঙের কোট-রবিউল করিম মৃদুল,দেশ পাবলিকেশন্স)

Saturday, 17 March 2018

পাপ

সাব্বির জাদিদের ‘পাপ’ পড়ে উঠে মনে হলো, এটা কি পড়লাম আমি! এ আবার কেমন উপন্যাস? যে উপন্যাসের সমাজের সঙ্গে আমার সমাজকে মেলাতে পারি না। উপন্যাসের চরিত্রের সঙ্গে আমার কোনো পরিচয় নেই। চরিত্রগুলোর নাম যদিও পরিচিত, তবু বেশ অদ্ভুত। আকাশ, বাতাসি, পাহাড়, সাগরি, নদী, বৈশাখী, পল্লবীসহ অনেক নাম। এদের আচরণও এদের নামের মতো অদ্ভুত।

ছাউনির নিচে বসবাস হলেও এরা বন-জঙ্গলে অবাধে ঘুরে বেড়ায়। বনের পশুদের সঙ্গেও এদের সখ্য রয়েছে। উপন্যাসের জায়গায় জায়গায় পশুপাখির সঙ্গে এদের অদ্ভুত অদ্ভুত আচরণ দেখে অবাক হয়েছি।
আমাদের মতো এরা দলবদ্ধভাবে বসবাস করলেও তাদের সমাজকাঠমো আমাদের চেয়ে ভিন্ন। মানুষে মানুষে যে সম্পর্ক, নারী-পুরুষের যে সম্পর্ক, এদের কাছে তার একটা অন্যরকম অর্থ রয়েছে!

এটি সময় থেকে ছিটকে পড়া একজোড়া প্রেমিক-প্রেমিকার স্বপ্নের ঘোরে বিচরণ করার আখ্যান হলেও এর মধ্যে আমাদের সভ্য সমাজের ‘পাপ’ করার প্রবণতার দিকটি প্রকাশিত হয়েছে ভিন্নভাবে, আদিম যুগের মানুষের সহজাত প্রবৃত্তির নিত্যনৈমত্তিক ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে, যা যুগপৎভাবে আমাদের জানান দেয়, মানুষের পদস্খলনের পুনঃপৌনিকতার, বেঁচে থাকার আশ্চর্য সব লড়াইয়ের।

‘কাম’ মানুষের স্বভাবজাত একটি মনোদৈহিক প্রবৃত্তির নাম।এই কামের সঙ্গে পাপের একটা সম্পর্ক আছে। উপন্যাসে এই কামকে উপজীব্য করে অনেক ঘটনার অবতারণা করা হয়েছে। যার মধ্যে নর-নারীর পরস্পরকে কাছে পাওয়ার যে বাসনা, তা মূর্ত হয়ে ওঠে।

অজ্ঞতা, কল্পনা ও ভয়ভীতি থেকে আদিকালে মানুষ কিভাবে ধর্মের প্রতি ঝুঁকেছে, আর কিছু মানুষ কিভাবে তার প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে, তারই একটা ধারণা পাওয়া যায় এই উপন্যাসের শেষের দিকে। যেখানে দেখা যায়, প্রাত্যহিক জীবনে ঘটে যাওয়া একটি সাধারণ চুরির ঘটনা থেকে কিভাবে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের নামে একটি জনপদের মানুষেরা দাঙ্গায় জড়িয়ে পড়ে, কিভাবে রক্তপিপাসু হয়ে ওঠে তারই একটি চিত্র।

সিনেমার মতো এই উপন্যাস শুরু হয়ে শেষ হয়েছে শ্বাসরুদ্ধকর এক অবিশ্বাস্য ঘটনার মধ্য দিয়ে। কল্পনার মাধুরী মিশিয়ে পাপের মৌলিক ধারণা থেকে মানুষ ও ফেরেশতার একইসঙ্গে বসবাসের যে জগৎ রচনা করেছেন লেখক, তার মধ্যে একবার ঢুকলে শেষ না করে বের হওয়া যায় না। এক ধরনের ঘোর লাগা কাজ করে।

এখানে ফেরেশতা-বিষয়ক যে ধারণা ব্যবহার করা হয়েছে, সেটাকে ইসলাম ধর্ম থেকে নেওয়া হলেও এ ধর্মের ফেরেশতাদের সঙ্গে এই উপন্যাসের চরিত্রদের শারীরিক কিংবা আচরণগত কোনো মিল নেই।

উপন্যাসের লেখকের গদ্যশৈলী সহজ-সরল, প্রাণবন্ত। শাব্দিক-ভাষিক কিংবা বর্ণনাগত কোনো জটিলতাও নেই।একনাগাড়ে পড়ে শেষ করে ফেলা যায় এমন একটি উপন্যাস।

(পাপ-সাব্বির জাদিদ,ঐতিহ্য)


 

বি:দ্র: রিভিউটি 'চিন্তাসূত্রে' প্রকাশিত।
লিংক:-http://www.chintasutra.com/2018/03/%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%aa-%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%9c-%e0%a6%a7%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%af%e0%a7%81%e0%a6%97%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a6%9a%e0%a6%bf%e0%a6%a4/

বিবিধ অভাব : লিওনার্দো লালন লাঁকা

‘চিত্রকলা, দর্শন, সংগীত, ভাষা, গ্রন্থপাঠ ও মঞ্চনাটক নিয়ে মোট ১৬টি প্রবন্ধের এক অনবদ্য সংকলন এটি। প্রত্যেক লেখাতেই পাঠক নতুন ভাবনার মুখোমুখি...