Translate

Showing posts with label মুক্তগদ্য. Show all posts
Showing posts with label মুক্তগদ্য. Show all posts

Tuesday, 5 August 2025

স্মৃতির কঙ্কাল ও জুলাইয়ের ভূত : এক অন্তর্বীক্ষণ



১.
এক বছর পেরিয়ে গেল, অথচ আমার ফেসবুকের সময়রেখা যেন থমকে আছে এক অদৃশ্য বিন্দুতে। হাসিনার পলায়ন কি কেবল একটি শাসনের শেষ ছিল, নাকি মুক্তিকামী মানুষদের ভেতরকার হারিয়ে যাওয়া বিচ্ছিন্ন সংযোগগুলো জোড়া লাগার এক নতুন শুরু? উচ্ছল-উশৃংখল-গতিহারা সেই এনিলিং পর্ব দেখার অভিজ্ঞতা সর্বক্ষেত্রে সুখকর ছিলো না যদিও; তৈরি হয়েছিলো এক আনন্দদায়ক অস্বস্তি (নাকি অস্বস্তিদায়ক আনন্দ)। কিন্তু এতোদিন পর, নিপীড়িত-নিষ্পেষিত জনগণের ‘স্বাধীনতার সুখ’ কেবলই কিছু শব্দে-বাক্যে কিম্বা আচারসর্বস্বতায় পর্যবসিত হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে!

২.
গত বছরের এই সময়ে দেশ ও দশের কী অবস্থা ছিল, মনে করার চেষ্টা করি; কিন্তু বিস্ময়করভাবে, পরিবারের বাইরের কারো মুখ, কোনো ঘটনা বা স্মারক আর সেভাবে মনে পড়ে না। স্মৃতির কঙ্কালগুলো হাতড়ে বেড়াই, কিন্তু পরিচিত মুখ, ঘটনা, এমনকি একটি কোলাহলও আজ খুঁজে পাই না। প্রশ্ন জাগে—আমার মস্তিষ্ক কি দুর্বল হয়ে যাচ্ছে দিনদিন? যেখানে ছোটবেলা থেকেই বিশেষ বিদ্যাভ্যাস-এর মাধ্যমে আমার ব্রেইন তথ্য ধরে রাখতে দারুণভাবে অভ্যস্ত, সেখানে আজকে কেন এই অদ্ভুত শূন্যতা?

জুলাইয়ের সেই উত্তাল বাতাস এখন স্তিমিত, কিন্তু তার ভূত যেন আজও তাড়া করে ফেরে আমার চিন্তার অলিন্দে। এই ব্যক্তিগত পরিবর্তনকেই হয়তো ইউয়ান ইয়াং তাঁর ‘প্রাইভেট রেভোলিউশনস’ বইয়ে বিবৃত করেছেন এভাবে—যখন বড় পরিসরের রাজনৈতিক বা সামাজিক অস্থিরতা ঘটে, তখন তার ছাপ পড়ে ব্যক্তিগত জীবনে, মানুষজন নিজেদের অজান্তেই এক ধরনের অভ্যন্তরীণ বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যায়। সার্বিককভাবে নীরব হলেও ভেতরে ভেতরে প্রভূত পরিবর্তন ঘটায়। এই পরিবর্তনই কি আমার মস্তিষ্কের সিন্যাপটিক প্লাসটিসিটি-কে কমিয়ে দিচ্ছে? স্মৃতির সঞ্চয় কমে যাওয়া, সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক (নাকি ধর্মীয়) বিরাজমান নৈরাজ্যই কি এর কারণ, যা আমার আত্মপরিচয়কে ক্রমাগত প্রশ্নবিদ্ধ করছে? প্রশ্ন অনেক, কিন্তু উত্তর আমার জানার পরিধির বাইরে অবস্থান করে, বর্তমানের ঘটনাপ্রবাহ আমাকে অন্য স্রোতে টেনে নেয়।

এই স্মৃতিভ্রংশতা কি এক ধরনের আত্মরক্ষা, নাকি এটিই বর্তমান উত্তর-সত্য/Post-truth সমাজের এক অনিবার্য পরিণতি, যেখানে সত্যের কোনো একক ব্যাখ্যা নেই? একসময় যা বস্তুনিষ্ঠতা/Objectivity নামক ধারণার মাধ্যমে বাস্তবতার একটি অভিন্ন বোঝাপড়া দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিত, আজ সেই ধারণাই যেন ভেঙে পড়েছে, আর আমাদের ধারণার জগৎকে গ্রাস করেছে বহুধা বিভক্ত সত্যের খণ্ডচিত্র।

৩.
জুলাইয়ের সেই দিনগুলোতে, যখন আমার চারপাশের পৃথিবী আক্ষরিক অর্থেই আমার দোরগোড়ায় এসে পৌঁছেছিল, তখন আমি নিজেই কিছু কথা লিখেছিলাম ছোট্ট পরিসরে, ফেসবুকে।

ফেসবুকীয় নিষ্ক্রিয়তা সময়ের পরিক্রমায় আমার ডিজিটাল অভ্যাসে পরিণত হয়ে উঠেছিলো ততোদিনে। এটিকে গভীরতর এক মানসিক বিচ্ছিন্নতার লক্ষণ হিসেবে শ্রেণিবিভক্ত করা গেলেও জুলাইয়ের ঘটনাবলী আমাকে কোনোভাবেই মননগত বিচ্ছিন্নবাদী হতে দেয়নি।
আর ব্যক্তিগত যাপনের বিবিধ বিপর্যয় সত্ত্বেও জুলাই ২০২৪-এর ‘লাল জুলাই’কে আমি কোনোভাবেই বিস্মৃত হতে দিতে চাই না। কারণ এই ঘটনা আমার কাছে কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, বরং বিদ্যমান বাস্তবতায় এটি ছিল একটি সামাজিক ট্র্যাজেডি। আমি জানার চেষ্টা করি, আমার সহনাগরিকরা কীভাবে এই ঘটনাকে স্মরণ করছে, বা কেন তারা একে বিস্মৃত হতে চাইছে। বিশেষ করে শহুরে শিক্ষিত-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মত-অভিমত, তাদের রুচি-অভিরুচি এবং ডিজিটাল পরিসরের এদের নানাবিধ কার্যকলাপ আমাকে নানাভাবে তাড়িত করে। তারা কি দ্রুত এই ঘটনাকে ভুলে যেতে চাইছে, নাকি তাদের নীরবতা এক ভিন্ন ধরনের প্রতিরোধের ইঙ্গিত?

পল লিঞ্চের ‘প্রফেট সং’ উপন্যাসের একটি বাক্য আমার মনে তীব্রভাবে অনুরণিত হয়— “পৃথিবীর সমাপ্তি সবসময় একটি স্থানীয় ঘটনা, এটি তোমার দেশে আসে এবং তোমার শহরে যায় এবং তোমার বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ে আর অন্যদের কাছে তা হয়ে থাকে কেবলই এক দূরবর্তী সতর্কতা, সংবাদের একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন, লোককথায় রূপান্তরিত হওয়া ঘটনার এক প্রতিধ্বনি।”
জুলাইয়ের ‘শেষ’টা আমার দরজায় কড়া নেড়েছিল, কিন্তু অনেকের কাছেই তা ছিল কেবলই এক দূরবর্তী সতর্কতা, সংবাদের একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন, লোককথায় রূপান্তরিত হওয়া ঘটনার এক প্রতিধ্বনি!

আর আমার কাছে যেটা সবচেয়ে অতি আশ্চর্যের বিষয় ছিল—তা হলো, জুলাইয়ের পর সমাজশরীর দ্রুত বিভাজিত হয়ে গেল। জুলাইপরবর্তীতে সমাজের এই দ্রুত বিভাজন এবং একে অপরের প্রতি অবিশ্বাস, যা লিঞ্চের কথারই প্রতিচ্ছবি। মানুষগুলো যেন রাতারাতি ভিন্ন ভিন্ন শিবিরে ভাগ হয়ে গেল। যারা একসময় কাঁধে কাঁধ মিলিয়েছিল, তারাই আজ একে অপরকে সন্দেহের চোখে দেখছে। ফেসবুকের ফিডগুলো হঠাৎ করেই যেন দুটি ভিন্ন বিশ্বের গল্প বলতে শুরু করল—একদল উদযাপন করছে বিজয়, আরেকদল শোকার্ত-উদ্ভ্রান্ত তাদের হারে। এই বিভাজন শুধু রাজনীতিতে নয়, বরং সমাজের প্রতিটি স্তরে, এমনকি ব্যক্তিগত সম্পর্কেও এর ছাপ পড়ল। অরওয়েলের ‘১৯৮৪’-এর মতো, সত্য যেন প্রতিটি পক্ষের নিজস্ব বয়ানে বদলে যাচ্ছিল, এবং গণস্মৃতিকে নিজেদের মতো করে গড়ে তোলার এক নীরব সংগ্রাম চলছিল। এই পরিবর্তন আমাকে বিমূঢ় করে তোলে, কারণ আমি কোনো নির্দিষ্ট শিবিরের অংশ হতে পারিনি, বা হয়তো চাইনি। কামু তাঁর ‘দ্য স্ট্রেঞ্জার’-এ দেখিয়েছেন, মের্সো জগতের অযৌক্তিকতার মুখে নির্বিকার থাকে, নিজের মতো করে। আমি আজ নিজেকে সেই মের্সোর মতোই দেখি—চারপাশের আলোড়ন আমাকে আর স্পর্শ করে না, যেন আমি এক দূরবর্তী পর্যবেক্ষক!

৪.
বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা আমাকে এক গভীর আত্মপরিচয়ের সংকটে ফেলেছে। ইন্টেরিম গভর্নমেন্টের হম্বিতম্বি, বিএনপির নির্বাচনি জম্বিপনা, জলপাই রঙের কোটের বাসিন্দাদের নানা দেনদরবার কিম্বা জামাত-এনসিপির বিবিধ হঠকারিতা—এই সব পক্ষই যেন অসদিচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে নিজস্ব সত্যের ধ্বজা উড়িয়ে চলেছে। কাফকার ‘দ্য ট্রায়াল’ উপন্যাসের জোসেফ কে-র মতো, আমি যেন এক অবোধ্য বিচার প্রক্রিয়ার মধ্যে আটকা পড়েছি, যেখানে আমার অপরাধ অজানা এবং বিচারক অদৃশ্য।

ইসলামপছন্দ ‘তৌহিদি জনতা’ কিংবা নাপছন্দ ‘প্রগতিবাদী’ চরমপন্থীদের—এই সব মেরুর মধ্যে আমি নিজেকে খুঁজে ফিরি। তবে ‘ইসলামপছন্দ’ অংশের দিকে তাকালে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখি। ইসলামের নিজস্ব যে এক সমৃদ্ধ বৌদ্ধিক ইতিহাস ছিল, যেখানে ইমান-আমল, তাহজিব-তামাদ্দুন; একইসঙ্গে দর্শন, ইজতিহাদ এবং প্রজ্ঞার নিরন্তর চর্চা ছিল, আজ সেখানে তাদের অনেক ‘প্রতিনিধি’র মধ্যে সেই উদার ও অনুসন্ধিৎসু মানসিকতার অনুপস্থিতি আমাকে পীড়া দেয়। অথচ চিন্তাগত রক্ষণশীলতা/বিচ্ছিন্নতাবাদের চর্চায় ইসলাম কখনোই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এই ধর্মমত ছিল যাবতীয় জ্ঞান ও যুক্তির বাতিঘর, একসময়ে। কিন্তু আধুনিক কালের কিছু ‘ধর্মাশ্রয়ী’ লোকদের সংকীর্ণ মনোভঙ্গি সেই ঐতিহাসিক জ্ঞানতাত্ত্বিক অভিজ্ঞতা কিম্বা প্রজ্ঞাকে চাপা দিয়ে রাখে/রাখতে চায়।

অন্যদিকে, ‘প্রগতিবাদী’ চরমপন্থীদের দিকে তাকালে দেখি, তাদের মধ্যেও একসময় সাম্য, মানবাধিকার ও বৈজ্ঞানিক যুক্তির যে ‘মহান আদর্শ’ ছিল, তা সময়ে সময়ে অসহিষ্ণু তাত্ত্বিক বিশুদ্ধতা বা অনমনীয় ডগমায় পর্যবসিত হয়েছে। জনমানুষের সমস্যা থেকে দূরে সরে গিয়ে তারা কেবল কিছু নির্দিষ্ট তাত্ত্বিক বৃত্তের মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে। একইসাথে ফ্যাসিবাদী নৈরাজ্যের অনুকূলে এরা করেছে ইসলামপন্থীদের প্রতি দুর্দমনীয় ঘৃণার চাষ এবং তাদের দমন-পীড়নের সম্মতি উৎপাদন। দুই প্রান্তের এই ‘চরমপন্থা’ই যেন আমাকে এক কঠিন দ্বিধায় ফেলে দেয়, যেখানে সত্যের খোঁজে আমি কোনো নির্দিষ্ট আশ্রয় পাই না।

ফলত, আমি বিদ্যমান সমস্ত মতাদর্শের বাইরে ‘হকপন্থি-বাংলাদেশপন্থি আমজনতা’-র মাঝে নিজেকে খুঁজে ফিরি। কিন্তু এই ‘আমজনতা’ কি কেবল আমার একটি আদর্শিক আকাঙ্ক্ষা, নাকি এর কোনো বাস্তব অস্তিত্ব আছে? এই দুই মেরুর বাইরে এক সাধারণ, নীতিবান একইসাথে দেশপ্রেমিক সত্তা খুঁজে পাওয়ার আমার এই সংগ্রাম আমাকে ক্রমশই বিচ্ছিন্ন করে তুলছে। আমি কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শের সঙ্গে নিজেকে মেলাতে পারি না, কারণ প্রতিটি মতাদর্শই যেন কোনো না কোনোভাবে সত্যকে বিকৃত করছে। আমার এই আত্মানুসন্ধান কি কেবলই ব্যক্তিগত? আমরা কি যে যার যার মতো করে নিজেদের মনপছন্দ মতের দিকে, পথের দিকে যাত্রা করছি না প্রতিনিয়ত? সেই অর্থে এটি কি একটি জাতির সামগ্রিক আত্মপরিচয় সংকটেরই প্রতিফলন নয়?

৫.
আমার এই সাময়িক নিষ্ক্রিয়তা, স্মৃতির বিভ্রম এবং আত্মপরিচয় অনুসন্ধানের সংগ্রাম—সবই জুলাই ২০২৪ গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তির এক গভীর তাত্ত্বিক ব্যঞ্জনা বহন করে, যার কোনো সহজ ঋণাত্মক ব্যাখ্যা নেই। অস্তিত্বের এই অনিশ্চয়তা আমার ভেতর এক নতুন উপলব্ধির জন্ম দিয়েছে—হয়তো কোনো একক সত্য নেই, কোনো নির্দিষ্ট আশ্রয় নেই (এখানে মহাজাগতিক সত্য/আশ্রয়-এর কথা বলছি না)। জগৎ-পরিস্থিতির যাবতীয় অযৌক্তিকতা মেনে নিয়েই হয়তো আমাদের টিকে থাকতে হয়।
এই অনিশ্চয়তার মাঝেও সংগ্রাম করে যাওয়াটাই হয়তো মানুষের নিয়তি। জুলাইয়ের ভূত হয়তো ভবিষ্যতেও আমার চিন্তার বিশাল জায়গাজুড়ে বিচরণ করবে, এই ভূতের উপস্থিতিই আমাকে মনে করিয়ে দিবে যে, বিস্মৃতি নয়, বরং প্রশ্ন করা এবং নিজের ‘সত্য’কে খুঁজে ফেরাই এই অস্থির সময়ে একমাত্র পথ। ‘ক্রসিং দ্যা বর্ডারস এন্ড ব্লারিং বাউন্ডারিজ’ এর এই যুগে, আমার এই অনুসন্ধান কেবল স্মৃতির ঝনঝনানি নয়, বরং এর মাধ্যমে আমি সীমা-সুরক্ষার ধারণাকে অতিক্রম করে এক বৃহত্তর জাগতিক ‘সত্যে’র সন্ধান করছি।
এটি এক বিচিত্র ঝাঁজ-রঙ-গন্ধ-স্বাদ-সংবলিত অভিজ্ঞতা, যা আমাকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে—হয়তো এই শূন্যতার গভীরে লুকিয়ে আছে এক নতুন আলো, যা একদিন আমজনতার সম্মিলিত কণ্ঠস্বর হয়ে উঠবে!

করুণানিধান দয়ার আধার মহান আল্লাহ সহায়...

Monday, 15 April 2019

পাঠচিন্তা

ক.
আমরা যখন কোনো বই পড়ি, তখন এক ধরণের চিন্তা আমাদের মধ্যে কাজ করে । ফিকশন, নন-ফিকশনের ক্ষেত্রে এই চিন্তা আলাদাভাবে কাজ করে যদিও ; তারপরও সেই চিন্তা ক্ষেত্র অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্নভাবে আমাদের চালিত করে এবং নানাভাবে আমাদের বাস্তব জীবনকে প্রভাবিত করে ।

খ.
আমরা যখন কোনো গল্প পড়ি তখন গল্পের চরিত্রের সাথে একাত্ম হয়েই পড়ি । কখনো কখনো আমরা পাঠের মাঝে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি গল্পের চরিত্র থেকে । লেখকসত্ত্বার সাথে পাঠকসত্ত্বার এই দ্বান্ধিক অবস্থানটি আমাদের জানান দেয় পাঠক হিসেবে আমাদের জানার সীমাকে, চিন্তার সামগ্রিক অবস্থানকে । মূলত এই কারণেই আমরা গল্প থেকে ছিটকে পড়ি । এই একই বিষয়টি লেখকের ক্ষেত্রেও সমানভাবে কার্যকর । অর্থাৎ স্বয়ং একজন লেখক এইসব পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই গল্পের চরিত্রকে দাঁড় করান নিজের সামনে । কেননা সবার একজন লেখককেই তার নিজের সৃষ্ট চরিত্রের সামনে দাঁড়াতে হয় । তাছাড়া পাঠককে ছাড়িয়ে যাওয়ার আগে চরিত্রটিকে তো স্বয়ং লেখককে ছাড়িয়ে যেতে হবে । তবেই তো চরিত্রটি ক্রমশ জীবন্ত হয়ে উঠবে । বেঁচে থাকবে হাজারো পাঠকের মাঝে ।
আমরা, পাঠকেরা তো সদা-সর্বদা নিজেদেরকেই খুঁজে বেড়াই গল্পের মাঝে, চরিত্রের মাঝে । নিরন্তর খুঁজে ফিরি আমাদের হারিয়ে যাওয়া চরিত্রকে,  আমাদের হারিয়ে যাওয়া সময়কে, স্বপ্নকে । কখনো কখনো খুঁজে পায় আর কখনো পায় না ।
তাই তো হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকি নিজেদেরকে, এক লেখকের গল্প থেকে অন্য লেখকের গল্পের মাঝে...

গ.
উপন্যাসের জগতটা ভিন্নতর ।
একজন ঔপন্যাসিক নানা আঙ্গিকে কোনো না কোনোভাবে আমাদের মহাকালের গর্ভে ঢুকিয়ে দেন । এবং একইসাথে অতীত-ইতিহাস, বর্তমান-ঘটমান আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দোলাচালে আমাদের পরিভ্রমণ করাতে থাকেন । আমরাও ঔপন্যাসিকের দেখানো পথে তার ভাব-চিন্তাকে,মতাদর্শিক কল্পনা-জল্পনাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা কাহিনীকে কিম্বা কখনো  কখনো চরিত্রকে আবিষ্কার-উদ্ভাবনে ব্যস্ত হয়ে পড়ি । অবচেতনে ।

ঘ.
প্রবন্ধপাঠের প্রকৃতি বিষয়বস্তু সাপেক্ষে একেক জনের একেক রকম হলেও মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষেত্রে প্রবন্ধের আবেদন মোটের উপর সকল পাঠকের কাছে একই রকম বলে মনে হয় । গল্প-উপন্যাস পাঠের মাঝে পাঠক কোনো কারণে পাঠ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে কিম্বা খেই হারিয়ে ফেললে পরবর্তিতে তার পাঠ চালিয়ে নিতে তেমন অসুবিধা হয় না । কেননা লেখক কাহিনী ও চরিত্রের মাঝে পারস্পরিক যে যোগসূত্র তৈরি করে দেন তা থেকে বিস্মৃত হওয়া অংশকে খুঁজে পেতে একজন পাঠকের তেমন বেগ পেতে হয় না ।

ঙ.
কবি ও কবিতা এই শব্দদ্বয় নিয়ে শাব্দিক-ভাষিক ও ভাবমূর্তিগত একটা ধোঁয়াশা ছোটবেলা থেকেই পাঠকমনে হাজির থাকে । ফলত ছোটবেলা থেকে পাঠ্যবইয়ের কবিতা থেকে কবিতা বুঝবার এবং তার ঐশ্বরিক সৌন্দর্য্য অবলোকন করবার যে দায় থাকবার কথা একজন কবিতার পাঠকের, পরীক্ষা ও এর শিখন কিম্বা পঠনপদ্ধতিসহ আরো কিছু বিবিধ হঠকারিতার কারণে সেই দায় আর কোনোভাবেই অবশিষ্ট থাকে বলে মনে হয় না আমার মতো পাঠকদের । তারপরও কিছু কিছু কবির কবিতা শৈশবে-কৈশোরের  অমলিন পবিত্র সব স্মৃতির মতো টানে ।
কিছু কিছু কবিতা মুখস্থ করে শুধু আবৃত্তি করতে ইচ্ছা করে । ইচ্ছা করে ডুব দিয়ে দিয়ে হারিয়ে যাই প্রতিটা শব্দের মাঝে । অনন্ত আকাশের মাঝে, শরতের আকাশের প্রতিচ্ছবি হয়ে থাকা ঐ নদীটার বুকের মধ্য দিয়ে!

চ.
আমরা যা-ই পড়ি না কেন, দিনশেষে আদতে যেটা পড়েছি সেটা থেকে কোনো না কোনোভাবে আমরা মূলত আমাদের চিন্তার রসদ যোগায় । তাই অবসরে সেসব বিষয় নিয়েই বেশি ভাবি যেসব বিষয় পড়েছি । আর আমরা যদি কোনো কাজে ব্যস্ত থাকি তাহলে যা পড়েছি তা আমাদের তাড়িত করে,অবচেতনে নানাভাবে আমাদের উদ্দীপ্ত করে। এবং অবশ্যই আমাদের পঠন-পাঠনকে প্রসারিত করতে, চিন্তার বিস্তার ঘটাতে এই পড়া ব্যাপক ভূমিকা পালন করে ।

রচনাকাল - ০৬/০৪/'১৮ইং - ০৯/০৪/'১৮ইং

Wednesday, 27 June 2018

আত্মগীতি

এক.
সমাজের শিকড়হীন মানুষদের মাঝে নিজেকে একটা আপদমস্তক শিকড় বলেই মনে হয় আমার । যে আমি বটবৃক্ষের শিকড়কে বিস্তার করেই চলেছি । ইদানিং  যেখানেই শিকড়কে মাটির গভীরে বিস্তার করতে গিয়েছি সেখানেই দেখি, মাটিগুলো নরম হয়ে আসছে । আর আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করি, প্রোথিত শিকড়গুলোও আগের মতো মাটির রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে নেই ।
ক্রমশ ঢিলে হয়ে আসছে; চারিদিকে যেন জল থৈ থৈ!

দুই.
আমার এই শিকড়; বইয়ের শিকড়!
বইপড়ার জাগতিক কোন লাভজনক দিক আপাত দৃশ্যমান হয়নি বলেই 'জন্মসূত্রে'র উদ্ধত খড়গ বহুমাত্রিক অপমান হয়ে হাজারো বৈষয়িক যন্ত্রণায় দগ্ধ মস্তিষ্ককে বার বার আঘাত করে চলেছে । যার ক্ষরণটা হচ্ছে শুধু হৃদয়ে । যা কেউ জানে না । হয়তো কোনদিন কেউ জানবেও না!

তিন.
কোথাও কোন আয়োজন নেই আমার এই বইপড়া নিয়ে । বাকিসব আয়োজন ঠিকই আছে!
অথচ কেউ জানবেনা বই পড়ে কি ক্ষতি হয়েছে আমার,তারা যে শুধু লাভটুকুই  চাই!
সুধীজন বলেন, বই পড়লে মাথা খোলে । অথচ আমি নাকি কেবল অথর্ব-অপদার্থ এক নিঃসঙ্গ কীটে পরিণত হয়েছি । যার চেয়ে ঐ চটপটে হুজুগে ছেলেটাই নাকি ভাল ছিল, যে কিনা সবার সাথে তাল মিলিয়ে চলত ।
আবার বলছেও যাচ্ছেতাই, বই পড়ে দিন দিন নাকি গন্ডমূর্খ হচ্ছি!

চার.
প্রবহমান ঘটনার স্রোতে বয়ে চলা এই পৃথিবীর তাবৎ ঘটনার মধ্যে আমার বইপড়ার বিষয়টি খুবই গৌণ ।
তথাপি আমি জ্বলন্ত সিরিয়ার আগুনের সংবাদ আর তার ইন্ধনের ইতিহাস এই বইয়েই পড়েছি । আর ফিলিস্তিনের গণমানুষের উপর ইহুদীদের রাষ্ট্রিক-সামরিক জাতিগত নিপীড়নের খবর পেয়েছি মাহমুদ দারবিশের কবিতায়, ঐসব উল্টোমুখো গণমাধ্যমের বিপরীতে দাঁড়িয়ে!

পাঁচ.
ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশকে নিয়ে গণমাধ্যমের যে রাজনীতি, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে তাদের যে পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ, একইসঙ্গে একটি দেশ কিংবা একটি পৃথিবীর দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেওয়ার কিংবা দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে দেওয়ার যে অনৈতিক প্রবণতা, তার শৃঙ্খলিত ইতিহাসকে, একইসাথে তার সাম্রাজ্যবাদী আচরণকে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করার দায় এবং এর (আপাত) যৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে জেনেছি এডওয়ার্ড সাঈদের বই পড়ে; যে দৃষ্টিভঙ্গি আমাকে দিয়েছে নতুন পথের দিশা, যেটা আর কেউই আমাকে  দেখাতে পারে নি ।
তারপরও আমার বইপড়া কিংবা বই সংগ্রহ করা নিয়ে আমাকে সবসময় একধরনের ডিপ্রেশনে থাকতে হয় । অনেক সমীকরণ মেলাতে হয়!

ছয়.
প্রেমের ঐন্দ্রজালিক উৎসের সন্ধান আমি বইয়েই পেয়েছি । এবং এর বহুমাত্রিক প্রকাশ যে মানুষের মনে কতো রকমের প্রভাব ফেলে; একই সাথে কৈশোরের দ্বিধা-ভয় মিশ্রিত অনুভূতিগুলো কিভাবে যাপিত জীবনের স্মৃতি মন্থনের অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে উঠে একসময় তার গল্পও তো আমি এই বইয়েই পড়েছি ।
নর-নারীর মনোদৈহিক অস্থিরতার কাল্পনিক অভিজ্ঞতা আর প্রকৃতির অসীম নাটকীয়তার গোপন পাঠ নিতে গিয়ে কতোরকম অনভিজ্ঞতার ভয়ংকর অথচ সুদর্শন ফাঁদে আটকে পড়েছি একসময়, তার কোন ইয়ত্তা নেই ।
আর এইসব ক্ষেত্রে সময়ে-অসময়ে আমি কতোবার কতোরকম ভাবে যে তাড়িত হয়েছি তার খবর-ই বা ক'জনে রাখে!

সাত.
হায়! শৈশবের উল্লেখযোগ্য কোন স্মৃতি আমার মস্তিষ্ক ধরে রাখতে পারে নি।পরম যত্নে তুলে রাখা একান্ত স্মৃতিগুলোও বিস্মৃত হয়ে যাচ্ছে দিন দিন । যাইহোক, তত্ত্ব আর তথ্যের ভারে নুব্জ্য হয়ে পড়া এই মস্তিষ্কে এখনো আমি আমার প্রথম বই পড়ার স্মৃতি ধরে রেখেছি!

মনে পড়ে, প্রথম প্রথম কমিক্সের বইয়ের প্রতি খুব ঝোঁক ছিল । চাচা চৌধুরি, নন্টে-ফন্টে আরো কতো কি।আহা! সচিত্র ছবির সাথে কাহিনিগুলো পড়তে তখন কি যে ভালো লাগতো ।
মনে আছে, স্কুলের পরিত্যক্ত বুকশেলফ থেকে কুড়িয়ে নিয়ে 'বামবি' আর 'কাঠেরপুতুল পিনিকিউ' নামের দু'টি বিদেশি কমিক্সের বইও পড়েছিলাম একবার ।
বামবি-সেই ছোট্ট হরিণ ছানা-র মায়াবি মুখটি এখনো চোখের সামনে ভাসছে যেন!

রাশেদ রউফের 'কাকবন্ধু ও ভূতের গল্প' আমার পড়া প্রথম গল্পের বই ।
ভূতের গল্পগুলো এখন আর মনে নেই । হাজারো বৈষয়িক স্মৃতির ভিড়ে সেগুলোকে হারিয়ে ফেলেছি । কাকবন্ধুর গল্পটি এখনো মনে আছে ।
'গল্প'রা হয়তো এভাবেই স্মৃতি তৈরি করে । আর পাঠকের মাঝে বেঁচে থাকে বহুদিন ।

সেসময় প্রচুর ভূতের গল্পও পড়েছি ।
এই ভূত-পেত্নির খপ্পরে পড়ে রাস্তার পাশের ভাসমান দোকানগুলো থেকে কতো কতো ভূত-পেত্নি সংগ্রহ করেছি । আর রাতের বেলা সেগুলো পড়ে পড়ে চেতনে-অবচেতনে কতোবার কতোরকমভাবে শিহরিত হয়েছি, ভাবলেই হাসি পায় এখন । আহা! বোকা শৈশব ।
আরো একটি বইয়ের কথা মনে পড়ছে এই মুহুর্তে ।
নাম 'অশরীরি' । লেখক প্রণব ভট্ট।উপন্যাসটির কাহিনি কি ছিল; তা আজ আর মনে নেই । তবে কালো রঙের প্রচ্ছদটা আবছা আবছা মনে আছে ।
'কাকবন্ধু ও ভূতেরগল্প'র পরে এটিই আমার পড়া প্রথম কোন উপন্যাসের বই।

আট.
ক্রিটিক্যাল চিন্তা-ভাবনা থেকে বই পড়লে পাঠরুচির পরিবর্তন হয় । একই সাথে ব্যাক্তির চিন্তাধারারও । তাছাড়া এক্ষেত্রে  লেখকের মতাদর্শিক অবস্থানের সাথে পাঠকের আদর্শিক অবস্থানেরও একটা পরিচয় হয়ে যায় । যার প্রভাব অত্যন্ত ব্যাপক । যখন পাঠকদেরকে রাজনীতি সচেতন, প্রগতিশীল কোন লেখকের বই পড়ে মার্কসীয় দর্শনে প্রভাবিত হয়ে বাম রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়তে দেখি,তখন তার যৌক্তিক প্রামাণ্যতা ক্রমশ স্পষ্ট হয় ।
আর এর সাথে ধীরে ধীরে যুক্ত হয় মুক্তচিন্তা, মুক্তিবুদ্ধির মতো অনুষঙ্গগুলো । শিল্প-সাহিত্যে যার প্রায়োগিক ব্যাবহার দেখে মুগ্ধ হই । প্রভাবিত হই ।

নির্মোহ আত্মসমীক্ষার কষ্টিপাথরে নিজেকে যাচাই করার ক্ষেত্রে পদ্ধতিগতভাবে এই পাঠাভ্যাস কনজারভেটিভ পাঠকদের পাঠের চেয়ে অধিকতর ফলপ্রসূ বলে মনে করি ।

নয়.
যখন কোন বই পড়ি, তার সাথে লেখকের দার্শনিক উপলব্ধির ভেতর দিয়ে যাই; তখন নিজের চিন্তার মধ্যে একটা আশ্চর্যজনক তারতম্যের উপস্থিতি টের পাই!
তাই কখনো কখনো যেই বইটি পড়ছি সেটি বন্ধ করে দিয়ে ঝিম ধরে বসে থাকি । চিন্তা করি । লেখকের ভাবনাকে নিজের মতো করে ভাববার চেষ্টা করি । অবশ্য এর ফলাফল যে সবসময় ইতিবাচক হয় এমনও না!
আবার কখনো কখনো নিজের ধারণাকে এগিয়ে রেখে পাঠ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও লেখকের সাথে বেশিরভাগ সময় ঠিক পেরে উঠি না । তখন নগন্য পাঠক হিসেবে একধরনের আত্মগ্লানি কাজ করে ।

দশ.
বইপড়ার কথা বলতে গিয়ে আসলে এখানে অামি নিজের কথাই বলেছি ।
নিজেই নিজের গীতি গেয়েছি; অনেকটা বইয়ের সাথে সাথে নিজেকে পড়ার মতো করে ।
আর আপন আলয়ের গান তো নিজেকেই গাইতে হয়, নিজের মতো করে, আত্মমগ্ন হয়ে, ধীরে ধীরে, খুব নিবিড়ভাবে!

পুনশ্চ, এটি দীর্ঘ সময় নিয়ে বিক্ষিপ্তভাবে লিখিত হয়েছে; তারপরও শুধুমাত্র বইপড়াকে বিবেচনার কেন্দ্রে রাখলে প্রতিটি পর্বের মধ্যে  হয়তো একটা যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যাবে, একইসাথে প্রাসঙ্গিকভাবে আমার স্মৃতি-পাঠ-চিন্তা-রুচি-বোধ আর বাতিরও!
অাদৌ কি?
কে জানে...

রচনাকাল~
২/৫/'১৮ইং--১৯/৬/'১৮ইং


বিবিধ অভাব : লিওনার্দো লালন লাঁকা

‘চিত্রকলা, দর্শন, সংগীত, ভাষা, গ্রন্থপাঠ ও মঞ্চনাটক নিয়ে মোট ১৬টি প্রবন্ধের এক অনবদ্য সংকলন এটি। প্রত্যেক লেখাতেই পাঠক নতুন ভাবনার মুখোমুখি...