Translate

Showing posts with label প্রবন্ধ. Show all posts
Showing posts with label প্রবন্ধ. Show all posts

Saturday, 29 November 2025

বিবিধ অভাব : লিওনার্দো লালন লাঁকা



‘চিত্রকলা, দর্শন, সংগীত, ভাষা, গ্রন্থপাঠ ও মঞ্চনাটক নিয়ে মোট ১৬টি প্রবন্ধের এক অনবদ্য সংকলন এটি। প্রত্যেক লেখাতেই পাঠক নতুন ভাবনার মুখোমুখি হবেন।’
ফ্ল্যাপের এই অংশে যে ‘নতুন ভাবনা’র মুখোমুখি হবার কথা বলা হচ্ছে পাঠকদের, তার সাথে খানিকটা পরিচিত হওয়ার বাসনা থেকেই মূলত বইটি পড়তে শুরু করি। পাঠশেষে সামষ্টিক উপলব্ধি কিম্বা জ্ঞানগত অভিজ্ঞতা (পরি)পূর্ণ হয়েছে এমন দাবি করছি না আপাতত। সেটা বুঝা যাবে এই লেখাটি পুরো পড়লে। তথাপি এই বইয়ের সাথে ‘অভাবী’দের পরিচয় করিয়ে দেওয়াটাই এই রচনার মূল উদ্দেশ্য।

চিত্রকলা চিন্তা : লিওনার্দোর চিতা—দৃষ্টির বিবর্তন

চিত্রকলা বিচারে চোখের ভূমিকা প্রধান। কোনো কিছু দেখতে দেখতে আমাদের মননে-মগজে নানা বোধের উদয় হয়, অবচেতনে; তৈরি হয় রুচি। এভাবেই আস্তে আস্তে আমাদের দেখার চোখ পাল্টে যেতে থাকে। কিন্তু কখনো কখনো আমাদের এই দৃষ্টি সংবেদনশীলতা (কালিক-স্থানিক প্রেক্ষাপটে) শিল্পকর্মের মূল ভাবনা-ভঙ্গিকে বুঝে উঠতে কিম্বা অন্যের কাছে মূর্ত করে তুলতে যথেষ্ট হয় না। এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজন হয় বিশেষজ্ঞ বা সমঝদার লোকের বিশ্লেষণমূলক দিকনির্দেশনার, যার মাধ্যমে আমাদের সাধারণ ‘চোখ’ থেকে সত্যিকারের ‘দেখা’র দৃষ্টি তৈরি হয়। এই সংকলনের চিত্রকলা বিষয়ক প্রবন্ধে লেখক নিজের সেই সমঝদারি বিশ্লেষণমূলক ভাবনাকেই পাঠকদের সাথে ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। বিশেষত, ‘দেয়ালে চাপা ভিঞ্চি : যুদ্ধে ছাপা শান্তি’ প্রবন্ধে  লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির আঁকা ‘দ্য বেটল অব অ্যাংগিয়ারি’  বা ‘অ্যাংগিয়ারির যুদ্ধ’ ফ্রেস্কো বা দেয়ালচিত্রটি নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে লেখক তুলে ধরেছেন যে, যুদ্ধবিরোধী ভিঞ্চি কিভাবে নিজের বিশ্বাস থেকে সরে না এসেও এই যুদ্ধভিত্তিক ফ্রেস্কোর কাজে হাত দিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে সেই কাজ ছেড়ে চলে যান—এই বিশ্বাস ও বাস্তবতার দ্বন্দ্বই হলো এই রচনার মূল বিষয়।

‘অভাবের ভাব : তিন পাগলের মেলা’র খবর

বইটির সবচেয়ে গভীর ও জটিল অংশ হলো এর দর্শন বিষয়ক প্রবন্ধগুলো। ‘অচিনদেশ : লালন, ফ্রয়েড ও লাকাঁ’ প্রবন্ধে লেখক জানাচ্ছেন—‘প্রাচ্যের দার্শনিক চিন্তার সাথে লালনের কথাকে পাশাপাশি রেখে পশ্চিমের চিন্তকদের চিন্তা ও ভাবনার পর্যবেক্ষণ করাই এই রচনার একমাত্র উদ্দেশ্য।’
লেখকের উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এসব বিষয়ে আমার যে চিন্তাগত অবস্থান; তার সাথে একটা বোঝাপড়া করার তাগিদ থেকেই মূলত পাঠ চালিয়ে নিয়ে যাওয়া।

লেখকের দাবি অনুযায়ী, লালনের ‘অচিন দেশ’ এবং ফ্রয়েড ও লাকাঁর ‘অচেতন’ তথা ‘ভাষা’ ও ‘ঈশ্বর বা ব্রহ্ম’—এসবের মধ্যে যে সাযুজ্য প্রথমে আবিষ্কার করেছিলেন সলিমুল্লাহ খান, এই প্রবন্ধে সেই আবিষ্কারকে পোক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে মাত্র। তবে এখানে একটি দ্বিমত জাগে—প্রাচ্যের চিন্তা চর্চার যে ঐতিহাসিক পরম্পরা; তার সাথে পাশ্চাত্যের আধুনিক চিন্তার সংশ্লেষ ঘটিয়ে পর্যালোচনাভিত্তিক যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন তিনি শেষ পর্যন্ত, সেটাকে আমার অসম্পূর্ণ বলে মনে হয়েছে। কেননা পাশ্চাত্যের যেসব দার্শনিক চিন্তা প্রাসঙ্গিকভাবে তিনি হাজির করেছেন তার লেখায়; বিপরীতে প্রাচ্যের ‘প্রতিনিধিত্বশীল’ কোনো দার্শনিক বা চিন্তকের এ বিষয়ক (অ)পরিপূর্ণ কোনো ভাবনার উপলব্ধিযোগ্য অস্তিত্ব আমরা পাই না। আদৌ কি? কে জানে!

এতদসত্বেও আমি (আমার পাঠকীয় সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়ে) স্বীকার করি, এখানে ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে যে বস্তুবাদী ধারণার একটা কাঠামোগত রূপ দিয়েছেন লেখক তার সাথে ঐক্যমত পোষণ করাটা আমার মতো পাঠকদের জন্য মোটেও সহজ ব্যাপার নয়। তারপরও, মাতৃভাষা বাংলায় দর্শনচর্চাকে গতিশীল করতে, একইসঙ্গে এবিষয়ে যুগে যুগে মানুষের যে চিন্তা-তৎপরতা; তার সাথে পাঠকদের কিঞ্চিৎ পরিচয় করিয়ে দিতে লেখকের এই প্রয়াস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করি।

এরপরে ‘পর ও পরম: লালন ও লাকাঁ’ প্রবন্ধে লালনের ‘আর আমারে মারিস নে মা’ গানটিকে উপলক্ষ করে লাকাঁর চিন্তায় ‘অপর’, ‘পর’ এবং ‘পরম’-এর সম্পর্কের দারুণ একটা প্রস্তাবনা হাজির করা হয়েছে। যেখানে লেখক ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন, কিভাবে ‘অভাবের ভাবে’র উৎপত্তি হয় এবং পরবর্তীতে সারা জীবনব্যাপী এর বিস্তার ‘সহজ মানুষ’কে তাড়িয়ে বেড়ায়। লেখক বলছেন—
পৃথিবীতে জন্ম মানেই বিশ্ব সংসারে, আকারের সাগরে সাঁতার কাটা শুরু, মানে অভাবের ভাব জেঁকে বসা আর নিরন্তর সেই অভাবের ভাব দূর করতে অবিরাম ছোটাছুটি, কখনো কখনো পরমের নিষেধ অমান্য, অতঃপর অপরের হাতে শাস্তি ভোগ এবং অবশেষে ‘আর আমারে মারিস নে মা/ বলি মা তোর চরণ ধরে ননী চুরি আর করবনা।’
সংগীত ও ভাষা : সম্প্রদায়ের সম্পর্ক

পার্থ সারথী গুপ্তের ‘বাংলায় সংগীত ও সম্প্রদায়বাদ’ লেখাটি নিঃসন্দেহে এই সংকলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এটি কেবল সংগীতের ইতিহাস নয়, বরং সংগীতের ধারার সঙ্গে কিভাবে সাম্প্রদায়িক ও সামাজিক বিভেদ বা ঐক্য জড়িয়ে আছে, সে বিষয়ে নতুন ভাবনা এনে দেয়।

‘গ্রন্থ ও মঞ্চনাটক : পাঠ প্রতিক্রিয়া’ পাঠের অভিজ্ঞতা

১.
পাঠ শুরু করেছিলাম বইটির শেষের দিক থেকেই। মূলত বিভিন্ন বই আর মঞ্চনাটকের প্রতিক্রিয়া হিসেবেই তৈরি করা হয়েছে এই অধ্যায়ের লেখাগুলো, যা বৃহত্তর মানবীয় আখ্যানের জন্ম, স্থায়িত্ব এবং ভাঙনের বিভিন্ন স্তরকে উন্মোচিত করে।

প্রথম লেখাটি আবুবকর সিদ্দিকের ‘প্রীতিময় স্মৃতিময়’ গ্রন্থটি পাঠের অভিজ্ঞতা নিয়ে। বইটি নিছক সাহিত্যিকদের ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ নয়, বরং এটি একটি সাংস্কৃতিক আখ্যানের সংরক্ষণাগার। এখানে স্বনামখ্যাত বারোজন কবি, সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিকের (যেমন: সত্যজিৎ রায়, বুদ্ধদেব বসু, বেগম সুফিয়া কামাল, শামসুর রাহমান, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস প্রমুখ) সঙ্গে লেখকের ব্যক্তিগত সাক্ষাৎ, পত্র চালাচালি ও স্মৃতির নমুনা হাজির করা হয়েছে।
এই আখ্যানগুলো প্রমাণ করে, কিভাবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা একটি সম্মিলিত সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে রূপান্তরিত হয়, যা অতীতে চলে যাওয়া ব্যক্তিত্বদের বর্তমান বাস্তবে বাঁচিয়ে রাখে।

পাঠপ্রতিক্রিয়ার শেষে তাঁর সাথে এই বইয়ের লেখকের ব্যক্তিগত স্মৃতির কথাও জানতে পারি।

২.
দ্বিতীয় পাঠপ্রতিক্রিয়া হাসান আজিজুল হকের আত্মজীবনীমূলক বই ‘ফিরে যাই ফিরে আসি’ নিয়ে।

লেখাটি শেষ হয়েছে লেখকের স্বাধীনতা বিষয়ক একটা অনুসিদ্ধান্ত দিয়ে। আত্মজীবনীতে একজন লেখকের স্মৃতির যে নির্যাস থাকে, সেটা কতটুকু সত্যাশ্রিত কিম্বা স্মৃতিভ্রমের প্রকোপ থেকে কতটা সুরক্ষিত অবস্থায় এই পর্যন্ত এসেছে তার সাথে একটা পাঠকীয় বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে এগিয়ে গেছেন লেখক। সে কারণে দেখতে পাই, হাসান আজিজুল হক এই বইয়ে যে স্মৃতিচারণ করেছেন; তাঁর জন্ম, শৈশব ও কৈশোরের আগ সময় পর্যন্ত সময়কে তিনি যেভাবে ধরেছেন গল্পের ঢংয়ে, ফিকশন আর নন-ফিকশনের যে ভেদরেখা; তাকে আবিষ্কার করতে গিয়ে রীতিমতো দ্বন্দ্বে পড়ে গিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন— স্মৃতি কি তবে এতটাই সৎ, অপ্রবঞ্চক থেকেছে ‘ভোরবেলাকার চোখে’ তে?

হাসান আজিজুল হক যে কালপর্বের স্মৃতি মন্থন করছেন এই বইয়ে, সেটা ঐতিহাসিক কারণে উপমহাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা সময়। একইসঙ্গে সেই সময়কার সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সংকটের চিত্রটাও তাঁর স্মৃতির অন্তর্গত। সেই হিসেবে তাঁর কৈশোরিক অভিজ্ঞতায় এই আত্মজীবনীতে অন্যান্য প্রান্তিক বিষয়ের মতো অবহেলিত না হয়ে বরঞ্চ অনেকটা অনিবার্যভাবে প্রতিফলিত হওয়ার কথা; ঐ চিত্রটা, অবচেতনে হলেও। কিন্তু তেমনটা হয়নি। এই দিক থেকে সম্ভবত লেখকের এমন প্রশ্ন তোলাটা অবান্তর নয়।

৩.
আহমদ ছফার উপন্যাস ‘একজন আলি কেনানের উত্থান পতন’-এর পাঠ প্রতিক্রিয়াটি একটু ভিন্নতর। মুক্তিযুদ্ধ ও তার পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের যে রাজনৈতিক তৎপরতা এবং তা নিয়ে আহমদ ছফার যে রাজনৈতিক ভাষ্য; তার একটা সংশ্লেষ আছে এই লেখাটিতে। একই পরিপ্রেক্ষিতে লেখা সলিমুল্লাহ খানের এবিষয়ক একখানা ভাবনাকেও হাজির করেছেন লেখক প্রসঙ্গক্রমে। বলা চলে বিস্তার ঘটিয়েছেন; যেখানে ছফার রাজনৈতিক ভাষ্য তুলে ধরে যে কিভাবে একটি বিপ্লবী বিশ্বাস দ্রুত ক্ষমতার রাজনীতি ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হাতে জিম্মি হয়ে একটি নতুন শাসক শ্রেণীতে পরিণত হতে পারে, যার মাঝে সলিমুল্লাহ খানের ভাবনাকে টেনে এনে লেখক দেখান যে বুদ্ধিজীবীরা কিভাবে আখ্যানের মাধ্যমে রাজনীতির এই বিবর্তনকে বাস্তবতার একটি নতুন সংজ্ঞা দিতে সচেষ্ট হন।

৪.
এই পাঠ প্রতিক্রিয়া থেকে জানতে পারি ‘নবারুণ ভট্টাচার্যের হারবার্ট উপন্যাস আদতে ইতিহাস ও রাজনীতিকে কবুল করে বলেছে দুটো কথা।’ যার মূল বক্তব্য হলো যে মানব সমাজ টিকে আছে সম্মতি এবং নিয়ন্ত্রণের উপর, যেখানে সমাজের একদল লোক তাদের আরাম ও স্থিতিশীলতার জন্য রাজনৈতিক চেতনার নিষ্ক্রিয়তাকে মেনে নেয়, যা শাসকদের জন্য সুবিধাজনক হয়। কিন্তু অন্যদিকে ‘বারুদ যেখানে জমবার সেখানে জমবেই...’ এই বক্তব্যটি মানব ইতিহাসের সেই অনিবার্য দ্বান্দ্বিকতা প্রকাশ করে, যখন কোনো কল্পিত ব্যবস্থা মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়, তখন সিস্টেম ভেঙে দিতে চাওয়া সেই বিদ্রোহী মনন অবশ্যই জেগে ওঠে, যা সামাজিক স্থিতাবস্থার বিবর্তনীয় ভঙ্গুরতাকেই নির্দেশ করে।

৫.
সলিমুল্লাহ খানের দু’টি বইয়ের আলোচনায় যুগপৎভাবে হাজির হয়েছে ইতিহাস পাঠের বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা; যা আমাদের একইসঙ্গে ইতিহাস পাঠের জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রণোদনা দেয়ার পাশাপাশি আবার তার বিনির্মাণের একটা প্রভাব বিস্তারি ধারার সাথেও পরিচয় করিয়ে দেয়।

আর ফ্রয়েডের ভাষাবিষয়ক ধারণাকে কাজে লাগিয়ে লাকাঁ ভাষার গঠনের যে বিমূর্ত জগতের সন্ধান দেন তাকে উন্মোচন করতে গিয়ে বা বলা ভালো আবিষ্কার করতে যেয়ে পরবর্তীতে সলিমুল্লাহ খান যে প্রস্তাবনা হাজির করেন; এই বইয়ে তারও একটা ধারণা পাই। যা সরাসরি জ্ঞানের বিবর্তন এবং বাস্তবতার প্রকৃতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কারণ ইতিহাসকে কেবল ঘটনার বিবরণ হিসেবে না দেখে, বরং এর বিনির্মাণ-এর একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার অর্থ হলো, আমরা সেই আখ্যানের স্তরবিন্যাস থেকে মুক্ত হতে চাই যা বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতার দ্বারা আরোপিত হয়েছে। এবং লাকাঁ ফ্রয়েডের ধারণাকে ব্যবহার করে দেখান যে ভাষা কেবল যোগাযোগ মাধ্যম নয়, এটিই আমাদের বাস্তবতার চূড়ান্ত কাঠামো, যা ইঙ্গিত করে যে মানুষ্যজাতি তার নিজস্ব তৈরি করা ভাষার বিমূর্ত জগতে বন্দী, যা তাদের চেতনা এবং পরিচয়কে নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে।

৬.
অনুপম হায়াতের বই ‘জহির রায়হানের চলচ্চিত্র : পটভূমি বিষয় ও বৈশিষ্ট্য’ নিয়ে এই নাতিদীর্ঘ আলোচনা থেকে জানতে পারি, চলচ্চিত্র নিয়ে জহির রায়হানের বহুমূখী তৎপরতা আর তাঁর এবিষয়ক নানা ভাবনার কথা। একইসঙ্গে একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে তাঁর কর্মকাণ্ডের ইতিবৃত্তও। বইটির পরিচিতিমূলক এই লেখাটিতে ধারাবাহিকভাবে উঠে এসেছে জহির রায়হানকে নিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, বিভিন্ন জনের স্মৃতিচারণে আর প্রতিবেদনে। যা প্রমাণ করে যে, চলচ্চিত্র কিভাবে একটি জাতির ঐতিহাসিক স্মৃতি ও রাজনৈতিক চেতনা নির্মাণে মৌলিক ভূমিকা রাখে।

এই সংকলনটি কেবল বিভিন্ন গ্রন্থ বা মঞ্চনাটকের প্রতিক্রিয়া নয়, বরং চিত্রকলা, দর্শন, স্মৃতি, রাজনীতি এবং ভাষার বহুস্তরিক ভাবনাগুলোর সাথে লেখক-পাঠকের ব্যক্তিগত বোঝাপড়ার যৌথ প্রচেষ্টা। বইয়ের কিছু কিছু বিষয়ের সাথে আমার পূর্বপরিচিতি ছিল। অল্প-বিস্তর পরিচয় ছিল আরো কিছু বিষয়ের সঙ্গে। কিন্তু অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েই আমি প্রথম জেনেছি এই বই থেকে। যা পরবর্তীকালে আমার চিন্তাচর্চায় ব্যাপক ভূমিকা রাখবে বলেই আমি আশা করি। বইটা পড়ার উদ্দেশ্যও ছিল সেটাই।

খসড়া/সেপ্টেম্বর/২০২০

বই সম্পর্কে~
নাম — বিবিধ অভাব : লিওনার্দো লালন লাঁকা
লেখক — বিধান রিবেরু
প্রচ্ছদ — ধ্রুব এষ
প্রকাশক — ঐতিহ্য
প্রচ্ছদ মূল্য — ২৬০৳

Sunday, 26 July 2020

মাদকাসক্তি : যুব সমস্যা যখন জাতীয় সমস্যা, প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ


ভূমিকার পরিবর্তে...

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাপী মাদকের যে বিস্তার এবং সামাজিক পরিসরে তার যে প্রভাব, তা অত্যন্ত ভয়াবহ। আধুনিক সমাজের মানুষদের সমস্যা বহুমাত্রিক। তন্মধ্যে যুবক-তরুণদের মাদকাসক্তির বিষয়টি নতুন বাস্তবতা হিসেবে হাজির হয়েছে পুরো বিশ্বে। পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় এই সমস্যা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে মহামারি আকারে। বাংলাদেশও এর থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। পৃথিবীতে নানা গবেষণা হচ্ছে এই সমস্যাকে কেন্দ্র করে। গবেষকরা তথ্য ও তত্ত্বের সমন্বয়ে বিষয়টিকে উপলব্ধিযোগ্য করে মানুষের সামনে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাস্তবতাকে বুঝতে তাদের এই গবেষণা পদ্ধতি পুরোপুরি সহায়ক নয়। তাই আমি এই লেখায় দেখাবো তথ্য-তত্ত্ব ও সত্যের সমন্বয়ে কিভাবে এই সমস্যার কারণগুলোকে চিহ্নিত করতে হয় এবং এর প্রতিকার-প্রতিরোধে বাস্তব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে হয়। এক্ষেত্রে লক্ষণীয় যে, অনেকগুলো গবেষণালব্ধ তথ্যকে এই লেখায় আমি ইচ্ছেমতো ব্যবহার করলেও পুরো আলোচনায় একটা ভিন্ন ধরণের গবেষণাকেই মূলত প্রাধান্য দিয়েছি । আমার এই বিবেচনা কতটুকু সঠিক কিংবা বেঠিক সেটা এই লেখা শেষ পর্যন্ত পড়লেই বুঝা যাবে। আর এই রচনার উদ্দেশ্য মূলত মাদকাসক্তির কার্যকারণ এবং এর প্রতিকার-প্রতিরোধের গতিপথকে আবিস্কার করা। সচেতন পাঠকদের পাঠের শুরুতেই রচনার এই উদ্দেশ্য সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়া জরুরি।

যাইহোক, আশা করি ভূমিকার পরিবর্তে আমার এই কথাগুলো মূল আলোচনা পড়ার উদ্দীপক হিসেবে কাজ করবে। আপাতত এটুকুই কাম্য!

মাদকাসক্তির কার্যকারণ...
মাদক সম্পর্কে প্রচলিত যে ধারণার কথা আমরা জানি, সেটা অনেকটা মাদকের রাসায়নিক প্রভাবের সাথে সম্পর্কযুক্ত। অর্থাৎ মাদক মানুষকে রাসায়নিক দাসে পরিণত করে। রাসায়নিক উপাদান মানুষকে এমনভাবে দখল করে নেয় যে, কোনো মাদকাসক্ত ব্যক্তির পক্ষে মাদক সেবন বন্ধ করে দেওয়াটা প্রায় অসম্ভব বলেই মনে হয়। এই ধারণার পশ্চাতে মূখ্য ভূমিকা পালন করে মস্তিষ্কের উপর মাদকের জৈবরাসায়নিক প্রভাবের ধারণা এবং একইসঙ্গে মানবশরীরের উপর মাদকের যে ক্ষতিকর প্রভাবগুলো আছে সেগুলোর ব্যাখ্যায় শুধুমাত্র ফার্মাকোলজিক্যাল কম্পনেন্ট বা ঔষধি উপাদানের ফলাফল বিশ্লেষণকে বিবেচনায় রাখা হয় বলে। কার্যত এই ধারণাগুলো সত্য হলেও আসলে প্রকৃত বিষয়টিকে পুরোপুরি জানতে-বুঝতে, ব্যাখ্যা করতে ধারণাগুলো যথেষ্ট নয়। তাই মাদকাসক্তির মূল কারণকে সনাক্ত করতে আমাদের প্রাসঙ্গিক আরো কিছু বিষয় সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখা প্রয়োজন।

মানব ইতিহাসে মাদকাসক্তির বিষয়টি কোন পর্যায়ে বিস্তার লাভ করেছে সেটা খুঁজে বের করতে গিয়ে কানাডার বৃটিশ কলম্বিয়ার সাইমন ফ্রেজার ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ব্রুস দেখলেন, মানুষকে যতবার তার বন্ধন থেকে ছিন্ন করা হয়েছে, ঠিক ততবারই মাদকাসক্তির প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। তাঁর ভাষ্যমতে, ডিজলোকেশন বা স্থানচ্যুতির একটা অনুভূতি মানুষকে মাদকাসক্তির দিকে নিয়ে যায়। এই স্থানচ্যুতি কেবল স্থানিক নয় বরঞ্চ কালিক প্রেক্ষাপটে ভিন্ন ভিন্ন সমাজ-সংস্কৃতির মানুষদের জন্য তা ভিন্নভাবে হতে পারে। ব্রুস উদাহরণ দেন

উত্তর আমেরিকার আদিবাসীদের কাছ থেকে তাদের ভূমি ও সংস্কৃতি কেড়ে নেওয়া হলো—তারা গণহারে অ্যালকোহল আসক্তিতে পড়লেন। আঠারো শতকে দরিদ্র ইংরেজদের তাদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করে অজানা-অচেনা শহরে পাঠানো হলো আর তারা জিন ক্রেইজে আক্রান্ত হলেন। ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে আমেরিকার গ্রামীণ অঞ্চলের বাজার ও ভর্তুকি হ্রাসের সাথে বাড়ল মেথাস্ফিটামিন (ইয়াবা) আসক্তি।
সুতরাং ব্রুস মনে করেন, ‘আজকের দিনে মাদকাসক্তি বিস্তারের কারণ হলো অতিব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী বা হাইপারইন্ডিভিজুয়ালিস্টিক, আতঙ্কিত ও সংকটগ্রস্ত এই সমাজ বেশিরভাগ মানুষকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে আলাদা বা বিচ্ছিন্ন করে ফেলে৷ মানুষ এই একটানা বিচ্ছিন্নতা থেকে মুক্তি খোঁজে। আসক্তির মধ্যেই তারা সাময়িক মুক্তি খুঁজে পায়৷ কারণ এর মাধ্যমে সে তার অনুভূতিগুলোর হাত থেকে মুক্তি পায়, অনুভূতিগুলো ভোঁতা করে ফেলে এবং একটা পরিপূর্ণ জীবনের বদলে নেশাগ্রস্ত জীবন খুঁজে পায়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে ব্রুসের এই পর্যবেক্ষণ খুবই প্রাসঙ্গিক। পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের মাদকগ্রহণকারীদের সিংহভাগই বয়সে যুবক-তরুণ। যার মধ্যে আবার বেকার আর ছাত্রদের সংখ্যায় বেশি। আমরা আমাদের চারপাশে একটু খেয়াল করলেই দেখতে পাবো, আমাদের যুব সমাজে বিদ্যমান মাদকাসক্তির কারণগুলো ব্রুসের চিহ্নিত কারণগুলোর চেয়ে অভিন্ন নয়। বিশেষ করে তাঁর ‘অতিব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদী’ ‘আতঙ্কিত’ ও ‘সংকটগ্রস্ত’ শব্দগুলো যেন আমাদের যুব সমাজের মাদকাসক্ত হওয়ার মনস্তাত্ত্বিক দিকটিকেই উন্মোচন করছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের মাদকাসক্ত সমাজের জন্য ব্রুসের এ কথাগুলো সত্য।
তাই মোটাদাগে বলা যায় যে, মাদকাসক্তির জৈবরাসায়নিক ভিত্তি মানুষের মাদকাসক্ত হওয়ার মূল কারণ নয়। তাহলে মূল কারণ কী?

মাদকাসক্তির কারণ নানাভাবে হাজির আছে আমাদের সমাজে। বলা চলে পরিবেশই সেখানে প্রধান উদ্দীপক হিসেবে কাজ করছে। তাই পরিবেশকে কেন্দ্রে রেখে কারণগুলোকে পর্যায়ক্রমে সূচিত করলে আমরা এর একটা সার্বজনীন চিত্র পাবো। যেটা আমাদের মাদকাসক্তির মূল কারণকে বুঝে উঠতে সাহায্য করবে। 

মাদকাসক্তির পরিবেশগত কয়েকটি কারণ...
মানুষের ব্যক্তিত্বের সাথে মাদকাসক্তির সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ মাদকের ব্যবহার যেমন ব্যক্তির আচরণকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। ঠিক তেমনি মাদকদ্রব্য ব্যবহারের প্রতি ব্যক্তিত্বের কিছু সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যও ব্যক্তিকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই দেখা যায়, ব্যক্তিত্বজনিত নানা মানসিক সমস্যা ভুগছেন এমন ব্যক্তিদেরই মাদক গ্রহণের প্রবণতা তূলনামূলক বেশি। আর কে না জানে ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের বিকাশে মূল ভূমিকা পালন করে তো এই পরিবেশই। এক্ষেত্রে জিনগত প্রভাব খুব অল্পই থাকে।

গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের নানাবিধ অনুসঙ্গ জড়িয়ে আছে এই মাদকাসক্তির পেছনে। যেখানে বলা হচ্ছে— সঙ্গদোষ, পারিবারিকভাবে আরোপিত মানসিক চাপ ও সমাজে বিদ্যমান প্রতিযোগিতার দর্শন যুব সমাজকে মাদকদ্রব্য গ্রহণের প্রতি উৎসাহিত করছে।
এসবের সাথে পরিবেশগত আরো একটি কারণ ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। আর সেটা হলো মাদকের সহজলভ্যতা। এই সহজলভ্যতা শুধুমাত্র বাংলাদেশের একক সমস্যা নয়। এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। অন্যদিকে আবার আন্তর্জাতিক মাফিয়াগোষ্ঠী আর সাম্রাজ্যবাদী শাসকেরা এই সমস্যাকে আরো ঘনীভূত করতে সদা তৎপর । কেননা এর সাথে যুক্ত রয়েছে ভূ-রাজনৈতিক অর্থনীতি। মোটকথা, পরিবেশে মাদকব্যবসায়ীরা এমন এক কৃত্রিম বাস্তুতন্ত্র গড়ে তুলেছে, যা মাদকের বিস্তারে প্রতিনিয়ত পুষ্টি যোগাচ্ছে। তাই এই পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে তুলতে আমাদের সবাইকে যার যার স্থান থেকে সম্মিলিতভাবে এর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। মাদকের এই সর্বনাশী আগ্রাসনের মোকাবিলায় সামগ্রিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

যুব সমাজের একটা বড় অংশের কাছে ধূমপান, মদ্যপান ইত্যাদি ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। এসব ছাড়া যেন পার্টি-আড্ডার জমেই না। অনেকেই আবার এটাকে স্রেফ বিলাসিতা হিসেবেই নেয়। কিন্তু এই বিলাসিতা যে একসময় তাদের আসক্তিতে পরিণত হয়, সেটা খুব কম যুবক-তরুণেরাই বুঝতে পারে। কিন্তু তাদের এই বোধ আদতে তখন আর কোনো কাজে আসে না। কেননা তাদের আসক্তি ঐ সময়ে এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, এর থেকে বেরিয়ে আসাটা তাদের জন্য রীতিমতো দুঃসাধ্য ব্যাপার হয়ে উঠে।

বর্তমান সময়ে নাটক কিংবা সিনেমা দেখে না এমন যুবক-তরুণ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর বটে। আর এই নাটক-সিনেমায় মাদককে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়, দর্শক মানসে তার প্রতিক্রিয়ায় যে অভিঘাতের সৃষ্টি হয়, তা নিঃসন্দেহে ক্ষতিকর। যেখানে মাদককে দেখানো হয় আনন্দ আর ফূর্তির উপলক্ষ হিসেবে, নিজের একাকিত্বকে উপভোগ্য করে তুলার উপায় হিসেবে কিংবা কখনো কখনো ডিপ্রেশন থেকে মুক্তির দিশা হিসেবে। আর এটা করা হয় উদ্দেশ্যমূলকভাবে। রীতিমত প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে। এক্ষেত্রে আবার সেন্সরশিপ নামে কর্তৃপক্ষের অদ্ভুত এক মাদকবিরোধী সার্কাসও আমরা দেখি!
আর এমন একটা পরিবেশে বসবাস করে মাদকমুক্ত সুস্থ-স্বাভাবিক জীবন-যাপন করা আমাদের যুবক-তরুণদের উল্লেখযোগ্য একটা অংশের জন্য বড়ই কঠিন!

যাইহোক, মাদকাসক্তির কার্যকারণের পরিবেশীয় গুরুত্ব কি তা বুঝতে মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ব্রুসের করা একটা পরীক্ষার কথা এখানে সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। বিষয়টি বাস্তবিক অর্থে কেমন তা ব্যাখ্যা করতে ব্রুস ইঁদুর নিয়ে একটি পরীক্ষা করেন। উদ্দেশ্য ছিল মাদকাসক্তির ফার্মাসিউটিক্যাল থিওরির পক্ষে যেসব প্রমাণ পাওয়া যায় তার সত্যতা যাচাই করা। প্রচলিত এসব প্রমাণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ইঁদুর নিয়ে করা কিছু জনপ্রিয় পরীক্ষা। যেখানে দেখানো হয়েছে যে, মাদকের রাসায়নিক তাড়না একটি ইঁদুরকে এতটাই কাবু করে ফেলে যে, আমৃত্যু ইঁদুরটি মাদকের সেই প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারে না। বদ্ধ খাঁচায় থেকে ক্রমাগত মাদক সেবনের ফলে একপর্যায়ে ইঁদুরটি মৃত্যুবরণ করে।
ব্রুসের কাছে এই পরীক্ষা অস্বাভাবিক মনে হলো। তাই তিনি পরীক্ষাটি একটু ভিন্নভাবে করতে চাইলেন। ব্রুস একই পরীক্ষা করলেন দুইভাবে। তিনি পরীক্ষার জন্য দু’টি ক্ষেত্র তৈরি করলেন। যেগুলোর পরিবেশ ছিলো সম্পূর্ণ বিপরীত। অর্থাৎ প্রথম ক্ষেত্রে ইঁদুরকে তিনি প্রচলিত পরীক্ষার মতো নিঃসঙ্গ রাখলেন। সাথে দিলেন শুধু মাদকদ্রব্য। আর দ্বিতীয় ক্ষেত্রকে তিনি বানালেন ‘র‍্যাট পার্ক’। একটা ইঁদুরের সম্ভাব্য যতোরকম চাহিদা থাকতে পারে, ব্রুস সেই চাহিদা পূরণের সবরকম বন্দোবস্ত করলেন সেখানে। ফলাফলও পেলেন হাতেনাতে।
ব্রুস শুধু ইঁদুরের উপর পরীক্ষা চালিয়েই ক্ষ্যন্ত হননি। মানুষের ক্ষেত্রে এই পরীক্ষা কতটুকু কার্যকর সেটাও তিনি খতিয়ে দেখেছেন। আর সেটা করেছেন ভিয়েতনাম যুদ্ধ ফেরত মাদকাসক্ত মার্কিন সৈনিকদের অবস্থাকে পর্যবেক্ষণ করে।
এই সবকিছু জেনে ব্রুস একটা তত্ত্ব দাঁড় করাতে শুরু করেন— যে তত্ত্ব মাদকাসক্তি সম্পর্কে আমাদের এযাবৎ যত ধারণা আছে তার বিপরীত শিক্ষা দেয় কিন্তু একমাত্র এর মাধ্যমেই বাস্তব অভিজ্ঞতার ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব হবে। যদি আপনার পরিবেশ ইঁদুরের ঐ র‍্যাট পার্কের মতো হয়— নিরাপদ ও সুখী একটি সমাজ যেখানে স্বাস্থ্যকর বন্ধন তৈরি ও আনন্দদায়ক কর্মকান্ড করা যায়, তাহলে আপনার মাদকাসক্ত হওয়ার বিশেষ কোনো ঝুঁকি থাকবে না। আপনার পরিবেশ যদি ইঁদুরের খাঁচার মতো হয়, যেখানে আপনি নিঃসঙ্গ, ক্ষমতাহীন ও উদ্দেশ্যহীন— তাহলে আপনার ঝুঁকি থাকবেই।

মাদকাসক্তি প্রতিকার-প্রতিরোধের গতিপ্রকৃতি...
মাদকাসক্তি প্রতিকার-প্রতিরোধের আলোচনার ক্ষেত্রে আমি মূলত দু’টি দিককে বিবেচনার কেন্দ্রে রেখেছি। ১. ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ। ২. রাষ্ট্র। আশা করি এই বিবেচনা আমাদের মাদকাসক্তি প্রতিরোধের গতিপ্রকৃতি বুঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে।

‘মাদকাসক্তি’ প্রতিকার-প্রতিরোধে ও নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের মূল প্রবণতাগুলো যেমন হতে পারে—

মাদকাসক্তি একটি ক্রনিক রিলাপসিং ডিসঅর্ডার। এটি যেহেতু মস্তিষ্কের রোগ। তাই এর চিকিৎসাও হতে হবে সেভাবে। অর্থাৎ এর চিকিৎসা হবে বহুমাত্রিক, সমন্বিত আর দীর্ঘমেয়াদী। শুধুমাত্র সাধারণ ওষুধের সাহায্যে এই রোগ থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। তাই এর পাশাপাশি মাদকাসক্ত ব্যক্তির মানসিক চিকিৎসাও সমানভাবে জরুরি। যেটা শুরু হতে পারে ব্যক্তিগতভাবে কিংবা পারিবারিকভাবে। পরবর্তীতে পুনঃ আসক্তি প্রতিরোধ প্রোগ্রামের মাধ্যমে অথবা গ্রুপ থেরাপি/থেরাপিউটিক কমিউনিটি, মোটিভেশন এনহেন্সমেন্ট থেরাপি ইত্যাদির সাহায্যও নেয়া যেতে পারে।
আমরা জানি, মাদকাসক্তি একটি প্রতিরোধযোগ্য ব্যাধি। তাই এটির প্রতিরোধে ব্যক্তি থেকে শুরু করে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সবাইকেই যার যার ভূমিকা যথাযথভাবে পালন করা চাই।

মাদকাসক্তি নিরাময়ে একটি পরিবার যেভাবে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখতে পারে, তেমনিভাবে এর প্রতিরোধেও ভূমিকা রাখতে পারে। দৃঢ় পারিবারিক বন্ধন এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসাবে কাজ করে। কারণ এইরকম ব্যক্তিগত সমস্যা সমাধানে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়াটা পোক্ত হওয়া চাই। কেননা এতে আলাপ-আলোচনাটা খোলামেলাভাবে করা যায়। সমস্যার গভীরতা ও গুরুত্ব নিরূপণ করা যায়। যার কারণে মাদকাসক্ত ব্যক্তির তত্ত্ববাধান করতে সুবিধা হয় পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের। এছাড়াও মাদকাসক্তি নিরাময়ে নতুন করে পারিবারিক রীতি-রেওয়াজ প্রতিষ্ঠা করতে, প্রয়োজনে পরিবর্তন করতে এই পারিবারিক গঠনতন্ত্র ব্যাপক ভূমিকা রাখে।

মাদকাসক্তি নিয়ন্ত্রণে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। যুব সমাজের একটা বড় অংশ মাদকবিষয়ক প্রাথমিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা যেহেতু এখান থেকেই লাভ করে। তাই স্কুল-কলেজ পর্যায়ে ছাত্র-ছাত্রীদের একটা নির্দিষ্ট সময় নজরদারিতে রেখে, তাদের আচরণবিধি পর্যবেক্ষণ-বিশ্লেষণ পূর্বক কারো আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে কর্তৃপক্ষের সেই অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নিতে আন্তরিক ও উদ্যোগী হতে হবে। ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে মাদকবিরোধী মনোভাব তৈরি করতে হবে। শুধু মাদক নয়, এরকম যেকোনো ধরণের হঠকারী-আত্মঘাতী বিষয়ে তারা যাতে ‘না’ বলতে শেখে, সেই বিষয়েও তাদের দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হতে হবে। একইসঙ্গে সমাজ-ধর্মের প্রতি ব্যক্তি মানুষের যে দায়বদ্ধতা, তার যথোপযুক্ত শিক্ষাও তাদের দিতে হবে। সর্বোপরি বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় সমাজে মাদকবিরোধী গণসচেতনতা তৈরি করতে হবে।
আর শেষোক্ত এই কাজটা করতে হবে সবাইকেই।

যুব সমাজকে মাদকাসক্তির হাত থেকে মুক্ত করতে চাইলে আমাদের কাজ শুরু করতে একদম প্রথম থেকেই। শৈশব-কৈশোর থেকেই।যারা এই সময়টাতে বিভিন্ন ধরণের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার মুখোমুখি হয়, সেটা হতে পারে যেকোনো ধরনের শারীরিক-মানসিক কিংবা যৌন নির্যাতনের ঘটনা। এবং এটা হতে পারে পরিবারের কোনো সদস্য দ্বারা, নিকটাত্মীয় দ্বারা অথবা বহিরাগত-অপরিচিত কারো দ্বারা। গবেষণা বলছে, শৈশব-কৈশোরে যারা এই ধরণের নির্যাতনের শিকার হয়েছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারাই পরবর্তীতে মাদকের দিকে ঝুঁকে গেছে। ধীরে ধীরে এবং একটা সময় মারাত্মকভাবে। তাই আমাদের অবিভাবকদের এইসব ব্যাপারগুলো যাতে না ঘটে সেক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। এরপরও যদি এরকম কোনো ঘটনা কারো সাথে ঘটে যায় তাহলে তার জন্য যথাযথ বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। আবশ্যিকভাবে। এতে ভবিষ্যতে ভিক্টিমের মাদকাসক্ত হওয়ার ঝুঁকিটা কমে যাবে। একইসঙ্গে শৈশব-কৈশোরের শারীরিক-মানসিক পরিবর্তনজনিত নানা আচরণগত জৈবিক সমস্যাবলি। যেমন— কনডাক্ট ডিজঅর্ডার, অপজিশনাল ডিফায়ান্ট ডিজঅর্ডার, অতিচঞ্চলতা রোগ ইত্যাদির লক্ষণ ও তার মনোদৈহিক প্রভাব সম্পর্কে অবিভাবকদের অল্পবিস্তর ধারণা থাকাটা বাঞ্ছনীয়। সেক্ষেত্রে ভবিষ্যতে কোনো ব্যক্তির দীর্ঘ মেয়াদে বাধ্যতামূলক মাদকসেবি হওয়ার সম্ভাবনা অধিকাংশ ক্ষেত্রে কমে যায়।

রাষ্ট্রে বিদ্যমান প্রতিরোধের চেহারা—

মাদকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের যে অনন্ত যুদ্ধ; তা মূলত প্রকারান্তরে জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। আর এই জনগণ যে আসলে গরীব জনগণ সেটা তো বলাই বাহুল্য। মাদকের বিস্তার রোধে যেসব রাষ্ট্রীয় তৎপরতা আমরা দেখতে পাচ্ছি, তার সম্ভাবনা ও পরিণতি কেমন হতে পারে তার নমুনা আমরা নিকট অতীতেই দেখেছি। তারপরও আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টা পুরোপুরি বুঝা সম্ভব না। তাই মাদক নির্মূলে আমাদের পাশ্ববর্তী দেশগুলোর যে তৎপরতা এবং এক্ষেত্রে তাদের সফলতা-ব্যর্থতার ইতিহাস ও অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। সেই অনুযায়ী উত্তরণের পথ ও পন্থা আমাদের নিজেদেরকেই তৈরি করতে হবে কিংবা খুঁজে নিতে হবে। আর এই কাজ যেহেতু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর, তাই মাদক পাচার ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে এদেরকে আরো সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারকে প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত উন্নয়নে অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর সক্ষমতা-কার্যকারিতা-বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে যথেষ্ট মনোযোগী হতে হবে।

এছাড়া শুধুমাত্র রাষ্ট্রের মাদক বিরোধী ইমেজ তৈরি করতে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত সেইসব দেশের অন্ধ অনুকরণ আমাদের জাতীয় জীবনে কি ভয়াবহ ভোগান্তি ও বিপদ ডেকে আনতে পারে তা কলম্বিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে সহজেই অনুমেয়। এখানে কলম্বিয়ার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট সিজার গ্যাভিরিয়ারের বক্তব্যটি প্রণিধানযোগ্য—“...আসলে আমরা বিশ্বাস করি না যে সামরিক সরঞ্জাম, পুলিশি নিপীড়ন আর বড় বড় জেলখানার মাধ্যমে মাদক সমস্যার সমাধান করা যাবে। জনস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার উন্নয়ন, দূর্নীতি—বিশেষত অর্থপাচারবিরোধী পদক্ষেপ আরও শক্তিশালীকরণ এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগের মাধ্যমেই প্রকৃতপক্ষে মাদকের চাহিদা ও সরবরাহ কমানো যেতে পারে।”

তাই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সত্যিকার অর্থে দেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করতে হলে রাষ্ট্রের সরকারকে এক্ষেত্রে সৎ হতে হবে। মাদক নির্মূলে সরকারের সর্বোচ্চ আন্তরিক প্রচেষ্টা থাকতে হবে। তবেই জনমানসে শান্তি ফিরবে। নিরপরাধ মানুষদের ভোগান্তি কমবে। একই প্রেক্ষাপটে হাজির থাকা বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডসহ সাধারণ মানুষদের উপর আরো যেসব রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন চালু আছে তা হ্রাস পাবে। রাষ্ট্র মাদক নির্মূলে সমর্থ হবে।

মাদকাসক্তি নিরাময়ে ধর্মীয় বিবেচনা—

ফিতরাতের কারণে মানুষের মনে ধর্মের একটা আধ্যাত্মিক প্রভাব সর্বদা ক্রিয়াশীল। যেকোনো মানুষের শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি তার আত্মিক প্রশান্তিরও প্রয়োজন হয়। তাই মাদকাসক্তি নিরাময়ে অন্যান্য চিকিৎসার সাথে ধর্মীয় বিবেচনাও গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ চিকিৎসার ক্ষেত্রে এই ধর্মীয় প্রভাব পরিপূরক হিসেবে কাজ করে।

মাদকাসক্তি প্রতিকারে ইসলামের ঐতিহাসিক ভূমিকা প্রাসঙ্গিকভাবে এখানে স্মরণ করা যেতে পারে। প্রাক-ইসলামি যুগে আরবীয় সংস্কৃতিতে মদ্যপান স্বাভাবিক ছিল। এমনকি ইসলামের প্রাথমিক যুগেও তা বৈধ ছিল। মাদক বিষয়ক আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার পরম্পরা খেয়াল করলে এবং একইসঙ্গে আয়াতগুলোর শব্দাবলি, বাক্যের ভঙ্গিময়তা আর অর্থের দিকে একটু লক্ষ্য করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়। নানা ঘটনার প্রেক্ষিতে মহান আল্লাহ মানুষের উপর মাদকের যে প্রভাব তার সাথে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)কে প্রাথমিকভাবে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন এভাবে—

قال الله تعالى: ﴿ يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ قُلْ فِيهِمَا إِثْمٌ كَبِيرٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَإِثْمُهُمَا أَكْبَرُ مِنْ نَفْعِهِمَا... ﴾ [البقرة : 219]

“তারা আপনাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করছে। আপনি বলুন, এ দু’টির মধ্যে রয়েছে মহাপাপ এবং মানুষের জন্য কিছুটা উপকার। তবে এগুলোর পাপ উপকারিতা অপেক্ষা অনেক বেশি।” (সূরা বাকারাহ্ : ২১৯ )

মাদক প্রধানত মস্তিষ্কের সেই অংশের (অগ্রমস্তিষ্ক) উপরই প্রভাব বিস্তার করে, মস্তিষ্কের যে অংশ মানুষের চিন্তা, বুদ্ধি, ইচ্ছাশক্তি, উদ্ভাবনীশক্তি প্রভৃতি উন্নত মানসিক বোধের নিয়ন্ত্রণ করে। তাই দেখা যায়, যেসব মানুষ কোনো নির্দিষ্ট উপলক্ষে তথা অনিয়মিতভাবে মাদক গ্রহণ করে তাদের মস্তিষ্ক একটা নির্দিষ্ট সময় পর মাদকের সেই প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারলেও মাদকাসক্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সময়ের অভাবে মস্তিষ্ক সেই প্রভাব কাটিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে না। ফলে মস্তিষ্ক তার নির্ধারিত কাজ যথাযথভাবে করতে সমর্থ হয় না। তাই এক পর্যায়ে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়।
মহান আল্লাহ মাদকের এই ভয়াবহতা ও তার নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ যুগপৎভাবে আমাদের স্বরণ করিয়ে দিয়েছেন যেভাবে—

قال الله تعالى: ﴿ إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ فَهَلْ أَنْتُمْ مُنْتَهُونَ ﴾ [المائدة :91].

“শয়তান চায় মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরের মাঝে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চারিত করে দিতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামায থেকে তোমাদেরকে বিরত রাখতে, অতএব তোমরা কি (এসব) ছাড়বে?” (সূরা মায়িদাহ্ : ৯১ )

মাদকাসক্তি প্রতিরোধেও ইসলামের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মাদককে নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে ইসলামের পর্যায়ক্রমিক অবস্থান পর্যবেক্ষণ করলেই আমরা দেখতে পাবো, ইসলামি শারীয়াহ্তে মাদক সংক্রান্ত বিধিনিষেধ আরোপ করার ক্ষেত্রে মানুষের স্বভাবজাত বিষয়গুলোকে খুবই গুরুত্বের সাথে দেখা হয়েছে। অর্থাৎ মাদকের ইতিবাচক-নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সর্বপ্রথম সবাইকে জানানো হয়েছে। সকলের সম্যক অবগতির পরই পরবর্তীকালে চূড়ান্ত বিধান দেওয়া হয়েছে তথা নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং ঘৃণ্য বস্তু হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে।
ইসলামের দৃষ্টিতে মাদকের যেকোনো ব্যবহার কতোটা নিকৃষ্টতর কাজ, নিম্নোক্ত হাদিস থেকেই তা বোধগম্য হওয়ার কথা। এই প্রসঙ্গে ইরশাদ হচ্ছে—

عن ابن عمر بن الخطاب رضي الله عنهما قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : ”لَعن اللهُ الخمرَ، وشارِبَها، وساقِيَها، وبائِعَها، ومُبتاعَها، وعاصِرَها، ومُعتَصِرَها، وحامِلَها، والمحمولةَ إليه، وآكِلَ ثَمنِها.“
(سنن أبي داود/5091)

আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেন— “মদ, যে ব্যক্তি পান করে, যে তা পান করায়, যে তা বিক্রি করে, যে তা ক্রয় করে, যে তা তৈরি করায়, যে তা তৈরি করে, যে তা বহন করে, যার জন্য তা বহন করা হয় এবং মূল্য ভক্ষণ করে, সকলের প্রতি আল্লাহ্ তা‘আলা অভিশাপ দেন।” (সুনানে আবু দাউদ/৫০৯১)

মোদ্দাকথা, মাদকাসক্তির প্রতিকার-প্রতিরোধে ইসলামি পথ ও পন্থা অনুসরণ করা গেলে তথা মানুষের সাথে ধর্মের আধ্যাত্মিক সংযোগ ঘটাতে পারলে কিংবা তাদের মাঝে ধর্মীয় চেতনা সৃষ্টি করতে পারলে নিঃসন্দেহে সার্বিকবিচারে মাদকাসক্তি থেকে মুক্তি পাওয়া সহজ হবে।

উপসংহারের পরিবর্তে...
বাংলাদেশের যুব সমাজের মাদকাসক্তির কারণ ও প্রতিকারের বিষয়ে ধারণা পেতে এই দীর্ঘ আলোচনা যথেষ্ট হবে বলে মনে করি। প্রেক্ষিতে যেহেতু বাংলাদেশ তাই মাদক বিষয়ে বর্তমান বিশ্বের সাম্প্রতিক স্বরূপ নিয়ে আলোচনা করাটা বাহুল্য বলেই মনে হয়েছে। বিশ্ববাস্তবতা বুঝতে আলোচনটা যদিও যুক্তিযুক্ত ছিল। এক্ষেত্রে তাই শুধুমাত্র ইঙ্গিত দিয়েছি।
অভ্যন্তরীণ নানা সমস্যায় জর্জরিত তৃতীয় বিশ্বের একটি ক্ষুদ্রতম দেশ বাংলাদেশ। আর যেহেতু একটি দেশের যুবক-তরুণরাই সে দেশের মূল চালিকাশক্তি। সেহেতু বলা যায়, দেশের এই যুবক-তরুণদের হাতেই আমাদের ভবিষ্যতের বাংলাদেশ। এবং একইসাথে দেশের সম্পদ-সাহস-অর্জন ও সঞ্চয়। দেশ ও জাতি গঠনে এদের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। তাই এই যুবশক্তির মাদকের অন্ধকারে বিলীন হয়ে যাওয়াটা মোটেও কাম্য নয়। সুতরাং সার্বিকভাবে পতনোন্মুখ এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে আশু বিপদ থেকে বাঁচাতে, একটুখানি আলো অথবা মুক্ত বাতাসের খোঁজ দিতে আমাদের সবাইকেই এগিয়ে আসতে হবে।

ঋণ স্বীকার...
লেখাটি তৈরি করতে নিম্নোক্ত বই এবং ওয়েবসাইটগুলোর সাহায্য নেওয়া হয়েছে।

বই –
১. আল-কোরআন।
২. সুনানে আবু দাউদ।
৩. কর্তৃত্ববাদ, আধিপত্য ও মুক্তির দিশা : বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা — গ্রন্থনা ও ভাষান্তর : কল্লোল মোস্তফা, সংহতি।

ওয়েবসাইট –
1) https://bit.ly/2BrASiA
2) https://bit.ly/3fWzgfC
3) https://bit.ly/32L1s16
4) https://bit.ly/39m16zf

রচনাকাল — ২৬/০৭/২০২০ইং

Saturday, 23 June 2018

বইমেলা

প্রতিবছর ফ্রেব্রুয়ারি মাসে ঢাকায় বাংলা একাডেমী ও সৃজনশীল প্রকাশনা সমিতি আয়োজিত 'একুশে বইমেলা'কে নিয়ে বাঙালী সাহিত্যপ্রেমীদের উচ্ছ্বাস আর আগ্রহের শেষ নেয়। বইকে নিয়ে এতবড় ও দীর্ঘস্থায়ী আয়োজন পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না। এই একটা মাসকে কেন্দ্র করে বই প্রকাশ আর বই বিক্রির ধুম পড়ে যায়।একই সাথে বেড়ে যায় লেখক-প্রকাশকদের ব্যস্ততাও। তাছাড়া  আর্থিক-বাণিজ্যিক দিক দিয়েও এর একটা উপযোগিতা আছে বৈকি।

এই একমাসে বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে বিবিধ বিষয়ে হাজার হাজার বই বের হয়। মানসম্পন্ন বই প্রকাশে প্রত্যেক প্রকাশনীর আলাদা স্বাতন্ত্র্য রয়েছে। তবে হাজার হাজার বইয়ের মধ্যে শিল্পের বিচারে কয়টি বই উত্তীর্ণ হতে পেরেছে?
এমন একটা প্রশ্ন শেষ পর্যন্ত থেকেই যায়।কেননা শিল্পের শক্তি ,শিল্পীর দায়-দায়িত্ব সম্মন্ধে লেখকের যথেষ্ট জানা-শুনা আছে কিনা? শিল্পী হিসেবে এই যন্ত্র ও যন্ত্রণার যুগে একজন লেখকের যে সংকট-সমস্যার অনুভূতি থাকা প্রয়োজন তা আছে কিনা? কিংবা এক্ষেত্রে তার উপলব্ধি রাষ্ট্র-সমাজকে ছাপিয়ে শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত চিন্তায় পর্যবসিত হয়েছে কিনা?

বইয়ের মানোন্নয়নের প্রশ্নে উপর্যুপরি এমন সব প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই চলে আসে।একই সাথে কয়টি বই পাঠকের চিন্তার বিবর্তনের পথকে উম্মুক্ত করেছে, কোন কোন বই পাঠকের চিন্তারাজ্যে ঝড় তুলেছে ; তার একটা হিসাব করার অনিবার্য বাস্তবতাও প্রাসঙ্গিকভাবে চলে আসে।
এর সাথে সাহিত্যকে পুঁজি করে শিল্পের যে অযাচিত ব্যাবহার উঠতি লেখকেরকে করতে দেখা যাচ্ছে,তা যুগপৎভাবে আমদেরকে হতাশ ও আশান্বিত করে। এখানে একথাও বলে রাখা জরুরি যে, বইকে পণ্য করে বিজ্ঞাপনের বহুমূখী পন্থা অবলম্বনের ক্ষেত্রে তরুণ লেখকেরা যেভাবে অগ্রসর হচ্ছে, বাংলা সাহিত্যের বিশ্বায়নের প্রশ্নে তা মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হতে পারে। একই সাথে হরেক রকম বিজ্ঞাপনের ভিড়ে মননশীল লেখকদের লেখাও চাপা পরে যেতে পারে তাদের বৈষয়িক সাহিত্যের সুদর্শন ঘেরাটোপে!

তবে আশার কথা এই যে,এসবের মাঝেও কিছু ধ্যানী তরুণ জগতের তাবৎ মগ্নতাকে নিজের মধ্যে ধারণ করে সাহিত্যের নিত্যনতুন দিগন্তের খবর তাদের নিরীক্ষাধর্মী গল্প-উপন্যাসের মাধ্যমে আমাদের  জানাচ্ছেন। যেটা আমাদেরকে আশান্বিত করে। কবিতার ক্ষেত্রে নতুন কন্ঠস্বর তৈরিতে তাদের যে শাব্দিক-ভাষিক করুকার্যতা,ভাব-সঙ্গতির যে অপূর্ব চিত্রায়ণ ; বাংলা সাহিত্যের জন্য তা আশাজাগানিয়া।

বাঙালি পাঠক সমাজকে নিয়ে সামষ্টিকভাবে কিছু বলার নেই। তাদের মধ্যে ব্যক্তি পছন্দকে এগিয়ে রেখে বই কেনার একটা আদিম প্রথা অনেক আগে থেকেই চালু আছে। তবে ইদানিং শুধুমাত্র অন্যের পছন্দ-অপছন্দের উপর ভর করে বই কেনার একটা প্রবণতা পাঠকদের মাঝে দেখা যাচ্ছে। অবশ্য ভক্ত-পাঠকদের মাঝেই এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। এই শ্রেণির পাঠকদের সিংহভাগই আবার বয়সে তরুণ। তারপরও জ্ঞানের বহুমাত্রিক চর্চার ক্ষেত্রে এটি বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করি। কেননা সিরিয়াস পাঠকেরা বই নির্বাচনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে গুরুত্ব দেয় বেশি।কখনোই অন্যের পাঠরুচিকে পুঁজি করে এরা বই নির্বাচন করে না।তবে সব কিছুর যেমব ব্যতিক্রম আছে, এক্ষেত্রেও তেমন কিছু ব্যতিক্রম আছে!
বইমেলা নিয়ে লেখাটি শুরু করলেও স্থানিক প্রেক্ষাপটে জায়গায় জায়গায় আলোচনার মোড় ঘুরে গেছে। এটি যে সচেতন ভাবে করা হয়েছে তা নয়। অনেকটা নিজের অজান্তেই হয়ে গেছে।আসলে মাঝে মাঝে বইমেলা নিয়ে নিজের মধ্যে একটা হতাশা কাজ করে। বইকে নিয়ে যখন ব্যবসা করা হয়। সুকৌশলে যখন চেতনার নামে মৌলবাদী ধ্যান ধারণা ঢুকিয়ে দেওয়া হয় বইয়ের মধ্যে। তখন সত্যিই আশাহত হই!

এত সবকিছুর পরেও নানা প্রতিবন্ধকতা-সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বইমেলা স্বমহীমায় আমাদের নাগরিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকবে।প্রতিবছর আমাদের মাঝে আসবে নির্মোহ আত্মসমীক্ষার কষ্টিপাথর হয়ে,যার মধ্যে আমরা আমাদের বৈষয়িক যাপিত জীবনের বাইরে নিজেকে একটু পরিশুদ্ধ করতে পারি!

রচনাকাল~ ১৬/০২/২০১৮


বিবিধ অভাব : লিওনার্দো লালন লাঁকা

‘চিত্রকলা, দর্শন, সংগীত, ভাষা, গ্রন্থপাঠ ও মঞ্চনাটক নিয়ে মোট ১৬টি প্রবন্ধের এক অনবদ্য সংকলন এটি। প্রত্যেক লেখাতেই পাঠক নতুন ভাবনার মুখোমুখি...