Translate

Saturday, 29 November 2025

বিবিধ অভাব : লিওনার্দো লালন লাঁকা



‘চিত্রকলা, দর্শন, সংগীত, ভাষা, গ্রন্থপাঠ ও মঞ্চনাটক নিয়ে মোট ১৬টি প্রবন্ধের এক অনবদ্য সংকলন এটি। প্রত্যেক লেখাতেই পাঠক নতুন ভাবনার মুখোমুখি হবেন।’
ফ্ল্যাপের এই অংশে যে ‘নতুন ভাবনা’র মুখোমুখি হবার কথা বলা হচ্ছে পাঠকদের, তার সাথে খানিকটা পরিচিত হওয়ার বাসনা থেকেই মূলত বইটি পড়তে শুরু করি। পাঠশেষে সামষ্টিক উপলব্ধি কিম্বা জ্ঞানগত অভিজ্ঞতা (পরি)পূর্ণ হয়েছে এমন দাবি করছি না আপাতত। সেটা বুঝা যাবে এই লেখাটি পুরো পড়লে। তথাপি এই বইয়ের সাথে ‘অভাবী’দের পরিচয় করিয়ে দেওয়াটাই এই রচনার মূল উদ্দেশ্য।

চিত্রকলা চিন্তা : লিওনার্দোর চিতা—দৃষ্টির বিবর্তন

চিত্রকলা বিচারে চোখের ভূমিকা প্রধান। কোনো কিছু দেখতে দেখতে আমাদের মননে-মগজে নানা বোধের উদয় হয়, অবচেতনে; তৈরি হয় রুচি। এভাবেই আস্তে আস্তে আমাদের দেখার চোখ পাল্টে যেতে থাকে। কিন্তু কখনো কখনো আমাদের এই দৃষ্টি সংবেদনশীলতা (কালিক-স্থানিক প্রেক্ষাপটে) শিল্পকর্মের মূল ভাবনা-ভঙ্গিকে বুঝে উঠতে কিম্বা অন্যের কাছে মূর্ত করে তুলতে যথেষ্ট হয় না। এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজন হয় বিশেষজ্ঞ বা সমঝদার লোকের বিশ্লেষণমূলক দিকনির্দেশনার, যার মাধ্যমে আমাদের সাধারণ ‘চোখ’ থেকে সত্যিকারের ‘দেখা’র দৃষ্টি তৈরি হয়। এই সংকলনের চিত্রকলা বিষয়ক প্রবন্ধে লেখক নিজের সেই সমঝদারি বিশ্লেষণমূলক ভাবনাকেই পাঠকদের সাথে ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। বিশেষত, ‘দেয়ালে চাপা ভিঞ্চি : যুদ্ধে ছাপা শান্তি’ প্রবন্ধে  লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির আঁকা ‘দ্য বেটল অব অ্যাংগিয়ারি’  বা ‘অ্যাংগিয়ারির যুদ্ধ’ ফ্রেস্কো বা দেয়ালচিত্রটি নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে লেখক তুলে ধরেছেন যে, যুদ্ধবিরোধী ভিঞ্চি কিভাবে নিজের বিশ্বাস থেকে সরে না এসেও এই যুদ্ধভিত্তিক ফ্রেস্কোর কাজে হাত দিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে সেই কাজ ছেড়ে চলে যান—এই বিশ্বাস ও বাস্তবতার দ্বন্দ্বই হলো এই রচনার মূল বিষয়।

‘অভাবের ভাব : তিন পাগলের মেলা’র খবর

বইটির সবচেয়ে গভীর ও জটিল অংশ হলো এর দর্শন বিষয়ক প্রবন্ধগুলো। ‘অচিনদেশ : লালন, ফ্রয়েড ও লাকাঁ’ প্রবন্ধে লেখক জানাচ্ছেন—‘প্রাচ্যের দার্শনিক চিন্তার সাথে লালনের কথাকে পাশাপাশি রেখে পশ্চিমের চিন্তকদের চিন্তা ও ভাবনার পর্যবেক্ষণ করাই এই রচনার একমাত্র উদ্দেশ্য।’
লেখকের উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এসব বিষয়ে আমার যে চিন্তাগত অবস্থান; তার সাথে একটা বোঝাপড়া করার তাগিদ থেকেই মূলত পাঠ চালিয়ে নিয়ে যাওয়া।

লেখকের দাবি অনুযায়ী, লালনের ‘অচিন দেশ’ এবং ফ্রয়েড ও লাকাঁর ‘অচেতন’ তথা ‘ভাষা’ ও ‘ঈশ্বর বা ব্রহ্ম’—এসবের মধ্যে যে সাযুজ্য প্রথমে আবিষ্কার করেছিলেন সলিমুল্লাহ খান, এই প্রবন্ধে সেই আবিষ্কারকে পোক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে মাত্র। তবে এখানে একটি দ্বিমত জাগে—প্রাচ্যের চিন্তা চর্চার যে ঐতিহাসিক পরম্পরা; তার সাথে পাশ্চাত্যের আধুনিক চিন্তার সংশ্লেষ ঘটিয়ে পর্যালোচনাভিত্তিক যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন তিনি শেষ পর্যন্ত, সেটাকে আমার অসম্পূর্ণ বলে মনে হয়েছে। কেননা পাশ্চাত্যের যেসব দার্শনিক চিন্তা প্রাসঙ্গিকভাবে তিনি হাজির করেছেন তার লেখায়; বিপরীতে প্রাচ্যের ‘প্রতিনিধিত্বশীল’ কোনো দার্শনিক বা চিন্তকের এ বিষয়ক (অ)পরিপূর্ণ কোনো ভাবনার উপলব্ধিযোগ্য অস্তিত্ব আমরা পাই না। আদৌ কি? কে জানে!

এতদসত্বেও আমি (আমার পাঠকীয় সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়ে) স্বীকার করি, এখানে ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে যে বস্তুবাদী ধারণার একটা কাঠামোগত রূপ দিয়েছেন লেখক তার সাথে ঐক্যমত পোষণ করাটা আমার মতো পাঠকদের জন্য মোটেও সহজ ব্যাপার নয়। তারপরও, মাতৃভাষা বাংলায় দর্শনচর্চাকে গতিশীল করতে, একইসঙ্গে এবিষয়ে যুগে যুগে মানুষের যে চিন্তা-তৎপরতা; তার সাথে পাঠকদের কিঞ্চিৎ পরিচয় করিয়ে দিতে লেখকের এই প্রয়াস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করি।

এরপরে ‘পর ও পরম: লালন ও লাকাঁ’ প্রবন্ধে লালনের ‘আর আমারে মারিস নে মা’ গানটিকে উপলক্ষ করে লাকাঁর চিন্তায় ‘অপর’, ‘পর’ এবং ‘পরম’-এর সম্পর্কের দারুণ একটা প্রস্তাবনা হাজির করা হয়েছে। যেখানে লেখক ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন, কিভাবে ‘অভাবের ভাবে’র উৎপত্তি হয় এবং পরবর্তীতে সারা জীবনব্যাপী এর বিস্তার ‘সহজ মানুষ’কে তাড়িয়ে বেড়ায়। লেখক বলছেন—
পৃথিবীতে জন্ম মানেই বিশ্ব সংসারে, আকারের সাগরে সাঁতার কাটা শুরু, মানে অভাবের ভাব জেঁকে বসা আর নিরন্তর সেই অভাবের ভাব দূর করতে অবিরাম ছোটাছুটি, কখনো কখনো পরমের নিষেধ অমান্য, অতঃপর অপরের হাতে শাস্তি ভোগ এবং অবশেষে ‘আর আমারে মারিস নে মা/ বলি মা তোর চরণ ধরে ননী চুরি আর করবনা।’
সংগীত ও ভাষা : সম্প্রদায়ের সম্পর্ক

পার্থ সারথী গুপ্তের ‘বাংলায় সংগীত ও সম্প্রদায়বাদ’ লেখাটি নিঃসন্দেহে এই সংকলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এটি কেবল সংগীতের ইতিহাস নয়, বরং সংগীতের ধারার সঙ্গে কিভাবে সাম্প্রদায়িক ও সামাজিক বিভেদ বা ঐক্য জড়িয়ে আছে, সে বিষয়ে নতুন ভাবনা এনে দেয়।

‘গ্রন্থ ও মঞ্চনাটক : পাঠ প্রতিক্রিয়া’ পাঠের অভিজ্ঞতা

১.
পাঠ শুরু করেছিলাম বইটির শেষের দিক থেকেই। মূলত বিভিন্ন বই আর মঞ্চনাটকের প্রতিক্রিয়া হিসেবেই তৈরি করা হয়েছে এই অধ্যায়ের লেখাগুলো, যা বৃহত্তর মানবীয় আখ্যানের জন্ম, স্থায়িত্ব এবং ভাঙনের বিভিন্ন স্তরকে উন্মোচিত করে।

প্রথম লেখাটি আবুবকর সিদ্দিকের ‘প্রীতিময় স্মৃতিময়’ গ্রন্থটি পাঠের অভিজ্ঞতা নিয়ে। বইটি নিছক সাহিত্যিকদের ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ নয়, বরং এটি একটি সাংস্কৃতিক আখ্যানের সংরক্ষণাগার। এখানে স্বনামখ্যাত বারোজন কবি, সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিকের (যেমন: সত্যজিৎ রায়, বুদ্ধদেব বসু, বেগম সুফিয়া কামাল, শামসুর রাহমান, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস প্রমুখ) সঙ্গে লেখকের ব্যক্তিগত সাক্ষাৎ, পত্র চালাচালি ও স্মৃতির নমুনা হাজির করা হয়েছে।
এই আখ্যানগুলো প্রমাণ করে, কিভাবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা একটি সম্মিলিত সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে রূপান্তরিত হয়, যা অতীতে চলে যাওয়া ব্যক্তিত্বদের বর্তমান বাস্তবে বাঁচিয়ে রাখে।

পাঠপ্রতিক্রিয়ার শেষে তাঁর সাথে এই বইয়ের লেখকের ব্যক্তিগত স্মৃতির কথাও জানতে পারি।

২.
দ্বিতীয় পাঠপ্রতিক্রিয়া হাসান আজিজুল হকের আত্মজীবনীমূলক বই ‘ফিরে যাই ফিরে আসি’ নিয়ে।

লেখাটি শেষ হয়েছে লেখকের স্বাধীনতা বিষয়ক একটা অনুসিদ্ধান্ত দিয়ে। আত্মজীবনীতে একজন লেখকের স্মৃতির যে নির্যাস থাকে, সেটা কতটুকু সত্যাশ্রিত কিম্বা স্মৃতিভ্রমের প্রকোপ থেকে কতটা সুরক্ষিত অবস্থায় এই পর্যন্ত এসেছে তার সাথে একটা পাঠকীয় বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে এগিয়ে গেছেন লেখক। সে কারণে দেখতে পাই, হাসান আজিজুল হক এই বইয়ে যে স্মৃতিচারণ করেছেন; তাঁর জন্ম, শৈশব ও কৈশোরের আগ সময় পর্যন্ত সময়কে তিনি যেভাবে ধরেছেন গল্পের ঢংয়ে, ফিকশন আর নন-ফিকশনের যে ভেদরেখা; তাকে আবিষ্কার করতে গিয়ে রীতিমতো দ্বন্দ্বে পড়ে গিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন— স্মৃতি কি তবে এতটাই সৎ, অপ্রবঞ্চক থেকেছে ‘ভোরবেলাকার চোখে’ তে?

হাসান আজিজুল হক যে কালপর্বের স্মৃতি মন্থন করছেন এই বইয়ে, সেটা ঐতিহাসিক কারণে উপমহাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা সময়। একইসঙ্গে সেই সময়কার সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সংকটের চিত্রটাও তাঁর স্মৃতির অন্তর্গত। সেই হিসেবে তাঁর কৈশোরিক অভিজ্ঞতায় এই আত্মজীবনীতে অন্যান্য প্রান্তিক বিষয়ের মতো অবহেলিত না হয়ে বরঞ্চ অনেকটা অনিবার্যভাবে প্রতিফলিত হওয়ার কথা; ঐ চিত্রটা, অবচেতনে হলেও। কিন্তু তেমনটা হয়নি। এই দিক থেকে সম্ভবত লেখকের এমন প্রশ্ন তোলাটা অবান্তর নয়।

৩.
আহমদ ছফার উপন্যাস ‘একজন আলি কেনানের উত্থান পতন’-এর পাঠ প্রতিক্রিয়াটি একটু ভিন্নতর। মুক্তিযুদ্ধ ও তার পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের যে রাজনৈতিক তৎপরতা এবং তা নিয়ে আহমদ ছফার যে রাজনৈতিক ভাষ্য; তার একটা সংশ্লেষ আছে এই লেখাটিতে। একই পরিপ্রেক্ষিতে লেখা সলিমুল্লাহ খানের এবিষয়ক একখানা ভাবনাকেও হাজির করেছেন লেখক প্রসঙ্গক্রমে। বলা চলে বিস্তার ঘটিয়েছেন; যেখানে ছফার রাজনৈতিক ভাষ্য তুলে ধরে যে কিভাবে একটি বিপ্লবী বিশ্বাস দ্রুত ক্ষমতার রাজনীতি ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হাতে জিম্মি হয়ে একটি নতুন শাসক শ্রেণীতে পরিণত হতে পারে, যার মাঝে সলিমুল্লাহ খানের ভাবনাকে টেনে এনে লেখক দেখান যে বুদ্ধিজীবীরা কিভাবে আখ্যানের মাধ্যমে রাজনীতির এই বিবর্তনকে বাস্তবতার একটি নতুন সংজ্ঞা দিতে সচেষ্ট হন।

৪.
এই পাঠ প্রতিক্রিয়া থেকে জানতে পারি ‘নবারুণ ভট্টাচার্যের হারবার্ট উপন্যাস আদতে ইতিহাস ও রাজনীতিকে কবুল করে বলেছে দুটো কথা।’ যার মূল বক্তব্য হলো যে মানব সমাজ টিকে আছে সম্মতি এবং নিয়ন্ত্রণের উপর, যেখানে সমাজের একদল লোক তাদের আরাম ও স্থিতিশীলতার জন্য রাজনৈতিক চেতনার নিষ্ক্রিয়তাকে মেনে নেয়, যা শাসকদের জন্য সুবিধাজনক হয়। কিন্তু অন্যদিকে ‘বারুদ যেখানে জমবার সেখানে জমবেই...’ এই বক্তব্যটি মানব ইতিহাসের সেই অনিবার্য দ্বান্দ্বিকতা প্রকাশ করে, যখন কোনো কল্পিত ব্যবস্থা মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়, তখন সিস্টেম ভেঙে দিতে চাওয়া সেই বিদ্রোহী মনন অবশ্যই জেগে ওঠে, যা সামাজিক স্থিতাবস্থার বিবর্তনীয় ভঙ্গুরতাকেই নির্দেশ করে।

৫.
সলিমুল্লাহ খানের দু’টি বইয়ের আলোচনায় যুগপৎভাবে হাজির হয়েছে ইতিহাস পাঠের বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা; যা আমাদের একইসঙ্গে ইতিহাস পাঠের জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রণোদনা দেয়ার পাশাপাশি আবার তার বিনির্মাণের একটা প্রভাব বিস্তারি ধারার সাথেও পরিচয় করিয়ে দেয়।

আর ফ্রয়েডের ভাষাবিষয়ক ধারণাকে কাজে লাগিয়ে লাকাঁ ভাষার গঠনের যে বিমূর্ত জগতের সন্ধান দেন তাকে উন্মোচন করতে গিয়ে বা বলা ভালো আবিষ্কার করতে যেয়ে পরবর্তীতে সলিমুল্লাহ খান যে প্রস্তাবনা হাজির করেন; এই বইয়ে তারও একটা ধারণা পাই। যা সরাসরি জ্ঞানের বিবর্তন এবং বাস্তবতার প্রকৃতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কারণ ইতিহাসকে কেবল ঘটনার বিবরণ হিসেবে না দেখে, বরং এর বিনির্মাণ-এর একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার অর্থ হলো, আমরা সেই আখ্যানের স্তরবিন্যাস থেকে মুক্ত হতে চাই যা বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতার দ্বারা আরোপিত হয়েছে। এবং লাকাঁ ফ্রয়েডের ধারণাকে ব্যবহার করে দেখান যে ভাষা কেবল যোগাযোগ মাধ্যম নয়, এটিই আমাদের বাস্তবতার চূড়ান্ত কাঠামো, যা ইঙ্গিত করে যে মানুষ্যজাতি তার নিজস্ব তৈরি করা ভাষার বিমূর্ত জগতে বন্দী, যা তাদের চেতনা এবং পরিচয়কে নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে।

৬.
অনুপম হায়াতের বই ‘জহির রায়হানের চলচ্চিত্র : পটভূমি বিষয় ও বৈশিষ্ট্য’ নিয়ে এই নাতিদীর্ঘ আলোচনা থেকে জানতে পারি, চলচ্চিত্র নিয়ে জহির রায়হানের বহুমূখী তৎপরতা আর তাঁর এবিষয়ক নানা ভাবনার কথা। একইসঙ্গে একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে তাঁর কর্মকাণ্ডের ইতিবৃত্তও। বইটির পরিচিতিমূলক এই লেখাটিতে ধারাবাহিকভাবে উঠে এসেছে জহির রায়হানকে নিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, বিভিন্ন জনের স্মৃতিচারণে আর প্রতিবেদনে। যা প্রমাণ করে যে, চলচ্চিত্র কিভাবে একটি জাতির ঐতিহাসিক স্মৃতি ও রাজনৈতিক চেতনা নির্মাণে মৌলিক ভূমিকা রাখে।

এই সংকলনটি কেবল বিভিন্ন গ্রন্থ বা মঞ্চনাটকের প্রতিক্রিয়া নয়, বরং চিত্রকলা, দর্শন, স্মৃতি, রাজনীতি এবং ভাষার বহুস্তরিক ভাবনাগুলোর সাথে লেখক-পাঠকের ব্যক্তিগত বোঝাপড়ার যৌথ প্রচেষ্টা। বইয়ের কিছু কিছু বিষয়ের সাথে আমার পূর্বপরিচিতি ছিল। অল্প-বিস্তর পরিচয় ছিল আরো কিছু বিষয়ের সঙ্গে। কিন্তু অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েই আমি প্রথম জেনেছি এই বই থেকে। যা পরবর্তীকালে আমার চিন্তাচর্চায় ব্যাপক ভূমিকা রাখবে বলেই আমি আশা করি। বইটা পড়ার উদ্দেশ্যও ছিল সেটাই।

খসড়া/সেপ্টেম্বর/২০২০

বই সম্পর্কে~
নাম — বিবিধ অভাব : লিওনার্দো লালন লাঁকা
লেখক — বিধান রিবেরু
প্রচ্ছদ — ধ্রুব এষ
প্রকাশক — ঐতিহ্য
প্রচ্ছদ মূল্য — ২৬০৳

Tuesday, 5 August 2025

স্মৃতির কঙ্কাল ও জুলাইয়ের ভূত : এক অন্তর্বীক্ষণ



১.
এক বছর পেরিয়ে গেল, অথচ আমার ফেসবুকের সময়রেখা যেন থমকে আছে এক অদৃশ্য বিন্দুতে। হাসিনার পলায়ন কি কেবল একটি শাসনের শেষ ছিল, নাকি মুক্তিকামী মানুষদের ভেতরকার হারিয়ে যাওয়া বিচ্ছিন্ন সংযোগগুলো জোড়া লাগার এক নতুন শুরু? উচ্ছল-উশৃংখল-গতিহারা সেই এনিলিং পর্ব দেখার অভিজ্ঞতা সর্বক্ষেত্রে সুখকর ছিলো না যদিও; তৈরি হয়েছিলো এক আনন্দদায়ক অস্বস্তি (নাকি অস্বস্তিদায়ক আনন্দ)। কিন্তু এতোদিন পর, নিপীড়িত-নিষ্পেষিত জনগণের ‘স্বাধীনতার সুখ’ কেবলই কিছু শব্দে-বাক্যে কিম্বা আচারসর্বস্বতায় পর্যবসিত হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে!

২.
গত বছরের এই সময়ে দেশ ও দশের কী অবস্থা ছিল, মনে করার চেষ্টা করি; কিন্তু বিস্ময়করভাবে, পরিবারের বাইরের কারো মুখ, কোনো ঘটনা বা স্মারক আর সেভাবে মনে পড়ে না। স্মৃতির কঙ্কালগুলো হাতড়ে বেড়াই, কিন্তু পরিচিত মুখ, ঘটনা, এমনকি একটি কোলাহলও আজ খুঁজে পাই না। প্রশ্ন জাগে—আমার মস্তিষ্ক কি দুর্বল হয়ে যাচ্ছে দিনদিন? যেখানে ছোটবেলা থেকেই বিশেষ বিদ্যাভ্যাস-এর মাধ্যমে আমার ব্রেইন তথ্য ধরে রাখতে দারুণভাবে অভ্যস্ত, সেখানে আজকে কেন এই অদ্ভুত শূন্যতা?

জুলাইয়ের সেই উত্তাল বাতাস এখন স্তিমিত, কিন্তু তার ভূত যেন আজও তাড়া করে ফেরে আমার চিন্তার অলিন্দে। এই ব্যক্তিগত পরিবর্তনকেই হয়তো ইউয়ান ইয়াং তাঁর ‘প্রাইভেট রেভোলিউশনস’ বইয়ে বিবৃত করেছেন এভাবে—যখন বড় পরিসরের রাজনৈতিক বা সামাজিক অস্থিরতা ঘটে, তখন তার ছাপ পড়ে ব্যক্তিগত জীবনে, মানুষজন নিজেদের অজান্তেই এক ধরনের অভ্যন্তরীণ বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যায়। সার্বিককভাবে নীরব হলেও ভেতরে ভেতরে প্রভূত পরিবর্তন ঘটায়। এই পরিবর্তনই কি আমার মস্তিষ্কের সিন্যাপটিক প্লাসটিসিটি-কে কমিয়ে দিচ্ছে? স্মৃতির সঞ্চয় কমে যাওয়া, সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক (নাকি ধর্মীয়) বিরাজমান নৈরাজ্যই কি এর কারণ, যা আমার আত্মপরিচয়কে ক্রমাগত প্রশ্নবিদ্ধ করছে? প্রশ্ন অনেক, কিন্তু উত্তর আমার জানার পরিধির বাইরে অবস্থান করে, বর্তমানের ঘটনাপ্রবাহ আমাকে অন্য স্রোতে টেনে নেয়।

এই স্মৃতিভ্রংশতা কি এক ধরনের আত্মরক্ষা, নাকি এটিই বর্তমান উত্তর-সত্য/Post-truth সমাজের এক অনিবার্য পরিণতি, যেখানে সত্যের কোনো একক ব্যাখ্যা নেই? একসময় যা বস্তুনিষ্ঠতা/Objectivity নামক ধারণার মাধ্যমে বাস্তবতার একটি অভিন্ন বোঝাপড়া দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিত, আজ সেই ধারণাই যেন ভেঙে পড়েছে, আর আমাদের ধারণার জগৎকে গ্রাস করেছে বহুধা বিভক্ত সত্যের খণ্ডচিত্র।

৩.
জুলাইয়ের সেই দিনগুলোতে, যখন আমার চারপাশের পৃথিবী আক্ষরিক অর্থেই আমার দোরগোড়ায় এসে পৌঁছেছিল, তখন আমি নিজেই কিছু কথা লিখেছিলাম ছোট্ট পরিসরে, ফেসবুকে।

ফেসবুকীয় নিষ্ক্রিয়তা সময়ের পরিক্রমায় আমার ডিজিটাল অভ্যাসে পরিণত হয়ে উঠেছিলো ততোদিনে। এটিকে গভীরতর এক মানসিক বিচ্ছিন্নতার লক্ষণ হিসেবে শ্রেণিবিভক্ত করা গেলেও জুলাইয়ের ঘটনাবলী আমাকে কোনোভাবেই মননগত বিচ্ছিন্নবাদী হতে দেয়নি।
আর ব্যক্তিগত যাপনের বিবিধ বিপর্যয় সত্ত্বেও জুলাই ২০২৪-এর ‘লাল জুলাই’কে আমি কোনোভাবেই বিস্মৃত হতে দিতে চাই না। কারণ এই ঘটনা আমার কাছে কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, বরং বিদ্যমান বাস্তবতায় এটি ছিল একটি সামাজিক ট্র্যাজেডি। আমি জানার চেষ্টা করি, আমার সহনাগরিকরা কীভাবে এই ঘটনাকে স্মরণ করছে, বা কেন তারা একে বিস্মৃত হতে চাইছে। বিশেষ করে শহুরে শিক্ষিত-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মত-অভিমত, তাদের রুচি-অভিরুচি এবং ডিজিটাল পরিসরের এদের নানাবিধ কার্যকলাপ আমাকে নানাভাবে তাড়িত করে। তারা কি দ্রুত এই ঘটনাকে ভুলে যেতে চাইছে, নাকি তাদের নীরবতা এক ভিন্ন ধরনের প্রতিরোধের ইঙ্গিত?

পল লিঞ্চের ‘প্রফেট সং’ উপন্যাসের একটি বাক্য আমার মনে তীব্রভাবে অনুরণিত হয়— “পৃথিবীর সমাপ্তি সবসময় একটি স্থানীয় ঘটনা, এটি তোমার দেশে আসে এবং তোমার শহরে যায় এবং তোমার বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ে আর অন্যদের কাছে তা হয়ে থাকে কেবলই এক দূরবর্তী সতর্কতা, সংবাদের একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন, লোককথায় রূপান্তরিত হওয়া ঘটনার এক প্রতিধ্বনি।”
জুলাইয়ের ‘শেষ’টা আমার দরজায় কড়া নেড়েছিল, কিন্তু অনেকের কাছেই তা ছিল কেবলই এক দূরবর্তী সতর্কতা, সংবাদের একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন, লোককথায় রূপান্তরিত হওয়া ঘটনার এক প্রতিধ্বনি!

আর আমার কাছে যেটা সবচেয়ে অতি আশ্চর্যের বিষয় ছিল—তা হলো, জুলাইয়ের পর সমাজশরীর দ্রুত বিভাজিত হয়ে গেল। জুলাইপরবর্তীতে সমাজের এই দ্রুত বিভাজন এবং একে অপরের প্রতি অবিশ্বাস, যা লিঞ্চের কথারই প্রতিচ্ছবি। মানুষগুলো যেন রাতারাতি ভিন্ন ভিন্ন শিবিরে ভাগ হয়ে গেল। যারা একসময় কাঁধে কাঁধ মিলিয়েছিল, তারাই আজ একে অপরকে সন্দেহের চোখে দেখছে। ফেসবুকের ফিডগুলো হঠাৎ করেই যেন দুটি ভিন্ন বিশ্বের গল্প বলতে শুরু করল—একদল উদযাপন করছে বিজয়, আরেকদল শোকার্ত-উদ্ভ্রান্ত তাদের হারে। এই বিভাজন শুধু রাজনীতিতে নয়, বরং সমাজের প্রতিটি স্তরে, এমনকি ব্যক্তিগত সম্পর্কেও এর ছাপ পড়ল। অরওয়েলের ‘১৯৮৪’-এর মতো, সত্য যেন প্রতিটি পক্ষের নিজস্ব বয়ানে বদলে যাচ্ছিল, এবং গণস্মৃতিকে নিজেদের মতো করে গড়ে তোলার এক নীরব সংগ্রাম চলছিল। এই পরিবর্তন আমাকে বিমূঢ় করে তোলে, কারণ আমি কোনো নির্দিষ্ট শিবিরের অংশ হতে পারিনি, বা হয়তো চাইনি। কামু তাঁর ‘দ্য স্ট্রেঞ্জার’-এ দেখিয়েছেন, মের্সো জগতের অযৌক্তিকতার মুখে নির্বিকার থাকে, নিজের মতো করে। আমি আজ নিজেকে সেই মের্সোর মতোই দেখি—চারপাশের আলোড়ন আমাকে আর স্পর্শ করে না, যেন আমি এক দূরবর্তী পর্যবেক্ষক!

৪.
বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা আমাকে এক গভীর আত্মপরিচয়ের সংকটে ফেলেছে। ইন্টেরিম গভর্নমেন্টের হম্বিতম্বি, বিএনপির নির্বাচনি জম্বিপনা, জলপাই রঙের কোটের বাসিন্দাদের নানা দেনদরবার কিম্বা জামাত-এনসিপির বিবিধ হঠকারিতা—এই সব পক্ষই যেন অসদিচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে নিজস্ব সত্যের ধ্বজা উড়িয়ে চলেছে। কাফকার ‘দ্য ট্রায়াল’ উপন্যাসের জোসেফ কে-র মতো, আমি যেন এক অবোধ্য বিচার প্রক্রিয়ার মধ্যে আটকা পড়েছি, যেখানে আমার অপরাধ অজানা এবং বিচারক অদৃশ্য।

ইসলামপছন্দ ‘তৌহিদি জনতা’ কিংবা নাপছন্দ ‘প্রগতিবাদী’ চরমপন্থীদের—এই সব মেরুর মধ্যে আমি নিজেকে খুঁজে ফিরি। তবে ‘ইসলামপছন্দ’ অংশের দিকে তাকালে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখি। ইসলামের নিজস্ব যে এক সমৃদ্ধ বৌদ্ধিক ইতিহাস ছিল, যেখানে ইমান-আমল, তাহজিব-তামাদ্দুন; একইসঙ্গে দর্শন, ইজতিহাদ এবং প্রজ্ঞার নিরন্তর চর্চা ছিল, আজ সেখানে তাদের অনেক ‘প্রতিনিধি’র মধ্যে সেই উদার ও অনুসন্ধিৎসু মানসিকতার অনুপস্থিতি আমাকে পীড়া দেয়। অথচ চিন্তাগত রক্ষণশীলতা/বিচ্ছিন্নতাবাদের চর্চায় ইসলাম কখনোই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এই ধর্মমত ছিল যাবতীয় জ্ঞান ও যুক্তির বাতিঘর, একসময়ে। কিন্তু আধুনিক কালের কিছু ‘ধর্মাশ্রয়ী’ লোকদের সংকীর্ণ মনোভঙ্গি সেই ঐতিহাসিক জ্ঞানতাত্ত্বিক অভিজ্ঞতা কিম্বা প্রজ্ঞাকে চাপা দিয়ে রাখে/রাখতে চায়।

অন্যদিকে, ‘প্রগতিবাদী’ চরমপন্থীদের দিকে তাকালে দেখি, তাদের মধ্যেও একসময় সাম্য, মানবাধিকার ও বৈজ্ঞানিক যুক্তির যে ‘মহান আদর্শ’ ছিল, তা সময়ে সময়ে অসহিষ্ণু তাত্ত্বিক বিশুদ্ধতা বা অনমনীয় ডগমায় পর্যবসিত হয়েছে। জনমানুষের সমস্যা থেকে দূরে সরে গিয়ে তারা কেবল কিছু নির্দিষ্ট তাত্ত্বিক বৃত্তের মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে। একইসাথে ফ্যাসিবাদী নৈরাজ্যের অনুকূলে এরা করেছে ইসলামপন্থীদের প্রতি দুর্দমনীয় ঘৃণার চাষ এবং তাদের দমন-পীড়নের সম্মতি উৎপাদন। দুই প্রান্তের এই ‘চরমপন্থা’ই যেন আমাকে এক কঠিন দ্বিধায় ফেলে দেয়, যেখানে সত্যের খোঁজে আমি কোনো নির্দিষ্ট আশ্রয় পাই না।

ফলত, আমি বিদ্যমান সমস্ত মতাদর্শের বাইরে ‘হকপন্থি-বাংলাদেশপন্থি আমজনতা’-র মাঝে নিজেকে খুঁজে ফিরি। কিন্তু এই ‘আমজনতা’ কি কেবল আমার একটি আদর্শিক আকাঙ্ক্ষা, নাকি এর কোনো বাস্তব অস্তিত্ব আছে? এই দুই মেরুর বাইরে এক সাধারণ, নীতিবান একইসাথে দেশপ্রেমিক সত্তা খুঁজে পাওয়ার আমার এই সংগ্রাম আমাকে ক্রমশই বিচ্ছিন্ন করে তুলছে। আমি কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শের সঙ্গে নিজেকে মেলাতে পারি না, কারণ প্রতিটি মতাদর্শই যেন কোনো না কোনোভাবে সত্যকে বিকৃত করছে। আমার এই আত্মানুসন্ধান কি কেবলই ব্যক্তিগত? আমরা কি যে যার যার মতো করে নিজেদের মনপছন্দ মতের দিকে, পথের দিকে যাত্রা করছি না প্রতিনিয়ত? সেই অর্থে এটি কি একটি জাতির সামগ্রিক আত্মপরিচয় সংকটেরই প্রতিফলন নয়?

৫.
আমার এই সাময়িক নিষ্ক্রিয়তা, স্মৃতির বিভ্রম এবং আত্মপরিচয় অনুসন্ধানের সংগ্রাম—সবই জুলাই ২০২৪ গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তির এক গভীর তাত্ত্বিক ব্যঞ্জনা বহন করে, যার কোনো সহজ ঋণাত্মক ব্যাখ্যা নেই। অস্তিত্বের এই অনিশ্চয়তা আমার ভেতর এক নতুন উপলব্ধির জন্ম দিয়েছে—হয়তো কোনো একক সত্য নেই, কোনো নির্দিষ্ট আশ্রয় নেই (এখানে মহাজাগতিক সত্য/আশ্রয়-এর কথা বলছি না)। জগৎ-পরিস্থিতির যাবতীয় অযৌক্তিকতা মেনে নিয়েই হয়তো আমাদের টিকে থাকতে হয়।
এই অনিশ্চয়তার মাঝেও সংগ্রাম করে যাওয়াটাই হয়তো মানুষের নিয়তি। জুলাইয়ের ভূত হয়তো ভবিষ্যতেও আমার চিন্তার বিশাল জায়গাজুড়ে বিচরণ করবে, এই ভূতের উপস্থিতিই আমাকে মনে করিয়ে দিবে যে, বিস্মৃতি নয়, বরং প্রশ্ন করা এবং নিজের ‘সত্য’কে খুঁজে ফেরাই এই অস্থির সময়ে একমাত্র পথ। ‘ক্রসিং দ্যা বর্ডারস এন্ড ব্লারিং বাউন্ডারিজ’ এর এই যুগে, আমার এই অনুসন্ধান কেবল স্মৃতির ঝনঝনানি নয়, বরং এর মাধ্যমে আমি সীমা-সুরক্ষার ধারণাকে অতিক্রম করে এক বৃহত্তর জাগতিক ‘সত্যে’র সন্ধান করছি।
এটি এক বিচিত্র ঝাঁজ-রঙ-গন্ধ-স্বাদ-সংবলিত অভিজ্ঞতা, যা আমাকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে—হয়তো এই শূন্যতার গভীরে লুকিয়ে আছে এক নতুন আলো, যা একদিন আমজনতার সম্মিলিত কণ্ঠস্বর হয়ে উঠবে!

করুণানিধান দয়ার আধার মহান আল্লাহ সহায়...

Thursday, 12 June 2025

লেখকের অভিজ্ঞতা ও শিল্পের পক্ষপাত : সৃষ্টির এক অনিবার্য শর্ত

Illustration : fast-ink-y43tNhAVDNs-unsplash

শিল্পীর সৃষ্টি, সে হোক কলমের আঁচড়ে সাহিত্য, তুলির ছোঁয়ায় চিত্রকর্ম, বা সুরের মূর্ছনায় সঙ্গীত—কোনোটাই তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাবমুক্ত নয়। এটি শুধু লেখকের ক্ষেত্রে নয়, শিল্পের প্রতিটি ক্ষেত্রে, এমনকি কিউরেটরদের (যেমন: শিল্প সমালোচক, সম্পাদক, গ্যালারির মালিক) ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সৃষ্টির এই গভীরে প্রোথিত ব্যক্তিগত প্রভাবকে প্রায়শই পক্ষপাত হিসেবে দেখা হয়, যা সবসময় নিন্দনীয় নয়, যদি তা স্বচ্ছ হয় এবং অন্যের জন্য ক্ষতিকর না হয়।

অভিজ্ঞতা : সৃষ্টির বীজমন্ত্র

একজন লেখকের শৈশব, পারিবারিক পরিবেশ, সামাজিক প্রেক্ষাপট, শিক্ষা, ভ্রমণ, আনন্দ-বেদনা, প্রেম-বিচ্ছেদ – এই সবকিছুই তার লেখার উপকরণ। এই অভিজ্ঞতাগুলো লেখকের মস্তিষ্কে জমা হয় এবং তার ভেতরের জগতকে নির্মাণ করে। যখন তিনি লিখতে বসেন, এই ভেতরের জগতই শব্দে প্রাণ পায়। যেমন, একজন গ্রামীণ লেখকের লেখায় গ্রামের মাটির গন্ধ, প্রকৃতির রূপ, সহজ-সরল মানুষের জীবন উঠে আসে অবলীলায়। পক্ষান্তরে, শহুরে জীবনের জটিলতা, আধুনিক সম্পর্ক, বা অস্তিত্বের সংকট ফুটে ওঠে একজন নগর-কেন্দ্রিক লেখকের কলমে। এমনকি গভীর ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডিও অনেক সময় শিল্পীকে এমন এক অন্তর্দৃষ্টি দেয় যা তার সৃষ্টিকে অমর করে তোলে। এই অভিজ্ঞতাগুলোই লেখকের স্বকীয় কণ্ঠস্বর তৈরি করে, যা তাকে অন্য সবার থেকে আলাদা করে তোলে।

পক্ষপাত : সৃষ্টির অনিবার্য দিক

এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই আসে পক্ষপাত। প্রতিটি মানুষই তার নিজস্ব লেন্স দিয়ে পৃথিবীকে দেখে, যা তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, বিশ্বাস, এবং মূল্যবোধ দ্বারা গঠিত। একজন লেখক যখন কোনো চরিত্র নির্মাণ করেন বা কোনো ঘটনার বর্ণনা দেন, তখন তার নিজস্ব বিশ্বাস এবং পক্ষপাত অজান্তেই তাতে প্রভাব ফেলে। উদাহরণস্বরূপ, একজন নারীবাদী লেখকের লেখায় নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়নের বিষয়টি প্রাধান্য পেতে পারে, যেখানে হয়তো একজন রক্ষণশীল লেখকের লেখায় ঐতিহ্যবাহী লিঙ্গ-ভূমিকা বেশি প্রতিফলিত হবে। এই ধরনের পক্ষপাত সব সময় নেতিবাচক নয়। বরং, এটি লেখকের অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি এবং তার কাজের মৌলিকতা প্রকাশ করে। পাঠক যখন একটি লেখা পড়েন, তখন তিনি লেখকের এই দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে অবগত থাকেন এবং সেই অনুযায়ী লেখাকে বিচার করেন।

সংবেদনশীলতা ও দায়বদ্ধতা : একটি নৈতিক প্রশ্ন

তবে, পক্ষপাতের একটি নেতিবাচক দিকও আছে। যখন এই পক্ষপাত অসংবেদনশীল হয়ে ওঠে এবং সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করে, নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের প্রতি ঘৃণা বা নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে, তখনই তা সমালোচিত হয়। একজন লেখকের সামাজিক দায়বদ্ধতা হলো, তার লেখনী যেন কারো প্রতি অন্যায় বা অসম্মানজনক না হয়। দুর্ভাগ্যবশত, সকল মানুষ সমান সংবেদনশীলতা দেখাতে পারে না। অনেক সময় অজ্ঞতা বা ব্যক্তিগত কুসংস্কার থেকে এমন লেখা তৈরি হয় যা অন্যের ক্ষতি করে।

কিউরেটরদের ক্ষেত্রেও এই পক্ষপাত স্পষ্ট। একজন সাহিত্য সমালোচক তার নিজস্ব বিচারবোধ, রুচি, এবং সাহিত্যিক মানদণ্ড দিয়ে একটি লেখাকে মূল্যায়ন করেন। তার ব্যক্তিগত পক্ষপাত একটি লেখার গ্রহণযোগ্যতা বা জনপ্রিয়তাকে প্রভাবিত করতে পারে। এই ক্ষেত্রে, কিউরেটরের দায়িত্ব হলো তার পক্ষপাত সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং যথাসম্ভব বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখার চেষ্টা করা, যদিও তা পুরোপুরি সম্ভব নাও হতে পারে।

ভারসাম্যের প্রয়োজনীয়তা

লেখকের অভিজ্ঞতা তার সৃষ্টির জন্য অপরিহার্য। এটিই তার লেখাকে প্রাণবন্ত ও মৌলিক করে তোলে। আর এই অভিজ্ঞতার অনিবার্য ফলস্বরূপ জন্ম নেয় পক্ষপাত। এই পক্ষপাত দোষের নয়, যদি তা স্বচ্ছ হয় এবং ক্ষতিকর না হয়। প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও পক্ষপাতকে কাজে লাগিয়ে এমন একটি সৃষ্টি তৈরি করা যা একই সাথে শক্তিশালী এবং সংবেদনশীল। একজন লেখক বা শিল্পীর জন্য এটি একটি নিরন্তর যাত্রা, যেখানে ব্যক্তিগত সত্যের প্রকাশ এবং বৃহত্তর সামাজিক দায়িত্ববোধের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়।

Wednesday, 31 July 2024

জুলাই বিপ্লব

ই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে একব্যক্তিকেন্দ্রীক কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থাকে সুসংহত করার গণবিরোধী প্রকল্পসমূহকে আরো একধাপ এগিয়ে নিতে আওয়ামীলীগ সরকার ছাত্রলীগ-পুলিশ-র‍্যাব-বিজিবিকে দিয়ে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের উপর স্থানীয় পর্যায়ে যেসব বলপ্রয়োগের ঘটনা ও হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে তার প্রতি তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং আন্দোলনকারীদের সাথে আরো (সু)দৃঢ়ভাবে একাত্মতা ঘোষণা করছি।

মনে রাখা জরুরি, আঘাত যারা করেছে এবং করিয়েছে তারা কিন্তু সহিংসতা উৎপাদনের কোনো পদ্ধতিই বাকি রাখে নাই এক্ষেত্রে। ব্যক্তি পর্যায়ের হাসি-ঠাট্টা-বিদ্রুপ থেকে শুরু করে মিডিয়াবাজি, গুজবতত্ত্ব, একাডেমিক-ননএকাডেমিক বুদ্ধিবৃত্তিক কড়িবর্গাদের দিয়ে তত্ত্বায়নের নানা বয়ান-বিশ্লেষণের পাশাপাশি কিভাবে সর্বাত্মক সহিংস একইসাথে (আপাত) অহিংস স্বৈরতন্ত্রী কলকব্জাগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার তারা করেছে, তাও আমরা দেখেছি। 

শুরু থেকেই ছাত্র-ছাত্রীদের এই ন্যায্য আন্দোলনকে; আমাদের যৌক্তিক প্রতিবাদ-প্রতিরোধকে সিস্টেমেটিক্যালি আঘাত করা হয়েছে, সংবদ্ধভাবে। আঘাতে আঘাতে জর্জরিত করে দগদগে ঘা তৈরি করা হয়েছে একের পর এক; আন্দোলনকারীদের সহজাত প্রতিক্রিয়ার পর আরো দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে দমন করার চেষ্টা করেছে (এবং এখনো করে যাচ্ছে) এই ফ্যাসিস্ট সরকার। কথাবার্তায়, আচার-আচরণে নূন্যতম সহনশীলতা-সংবেদনশীলতা দেখানো তো দূরের কথা; বরঞ্চ পুরো আন্দোলনে একজন সাইকোপ্যাথের ধ্বংসাত্বক ভূমিকায় দেখা গেছে তথাকথিত ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’কে। 

বাংলাদেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে ‘মাননীয়’র এই অমোচনীয় ভূমিকাকে এদেশের ভবিষ্যতের জনগণ অবশ্যই ঘৃণা সহযোগে স্বরণ করবে। কেননা, ‘ক্ষমতার বিরুদ্ধে (গণ)মানুষের লড়াই মূলত বিস্মৃতির বিরুদ্ধে স্মৃতির লড়াই’। 

মিলান কুন্ডেরার এই কথা স্থান-কাল নির্বিশেষে নিপীড়িত-নিষ্পেষিত জনগণের অধিকারের লড়াইয়ের প্রশ্নে পৃথিবীর সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য সত্য।

Sunday, 26 July 2020

মাদকাসক্তি : যুব সমস্যা যখন জাতীয় সমস্যা, প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ


ভূমিকার পরিবর্তে...

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাপী মাদকের যে বিস্তার এবং সামাজিক পরিসরে তার যে প্রভাব, তা অত্যন্ত ভয়াবহ। আধুনিক সমাজের মানুষদের সমস্যা বহুমাত্রিক। তন্মধ্যে যুবক-তরুণদের মাদকাসক্তির বিষয়টি নতুন বাস্তবতা হিসেবে হাজির হয়েছে পুরো বিশ্বে। পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় এই সমস্যা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে মহামারি আকারে। বাংলাদেশও এর থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। পৃথিবীতে নানা গবেষণা হচ্ছে এই সমস্যাকে কেন্দ্র করে। গবেষকরা তথ্য ও তত্ত্বের সমন্বয়ে বিষয়টিকে উপলব্ধিযোগ্য করে মানুষের সামনে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাস্তবতাকে বুঝতে তাদের এই গবেষণা পদ্ধতি পুরোপুরি সহায়ক নয়। তাই আমি এই লেখায় দেখাবো তথ্য-তত্ত্ব ও সত্যের সমন্বয়ে কিভাবে এই সমস্যার কারণগুলোকে চিহ্নিত করতে হয় এবং এর প্রতিকার-প্রতিরোধে বাস্তব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে হয়। এক্ষেত্রে লক্ষণীয় যে, অনেকগুলো গবেষণালব্ধ তথ্যকে এই লেখায় আমি ইচ্ছেমতো ব্যবহার করলেও পুরো আলোচনায় একটা ভিন্ন ধরণের গবেষণাকেই মূলত প্রাধান্য দিয়েছি । আমার এই বিবেচনা কতটুকু সঠিক কিংবা বেঠিক সেটা এই লেখা শেষ পর্যন্ত পড়লেই বুঝা যাবে। আর এই রচনার উদ্দেশ্য মূলত মাদকাসক্তির কার্যকারণ এবং এর প্রতিকার-প্রতিরোধের গতিপথকে আবিস্কার করা। সচেতন পাঠকদের পাঠের শুরুতেই রচনার এই উদ্দেশ্য সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়া জরুরি।

যাইহোক, আশা করি ভূমিকার পরিবর্তে আমার এই কথাগুলো মূল আলোচনা পড়ার উদ্দীপক হিসেবে কাজ করবে। আপাতত এটুকুই কাম্য!

মাদকাসক্তির কার্যকারণ...
মাদক সম্পর্কে প্রচলিত যে ধারণার কথা আমরা জানি, সেটা অনেকটা মাদকের রাসায়নিক প্রভাবের সাথে সম্পর্কযুক্ত। অর্থাৎ মাদক মানুষকে রাসায়নিক দাসে পরিণত করে। রাসায়নিক উপাদান মানুষকে এমনভাবে দখল করে নেয় যে, কোনো মাদকাসক্ত ব্যক্তির পক্ষে মাদক সেবন বন্ধ করে দেওয়াটা প্রায় অসম্ভব বলেই মনে হয়। এই ধারণার পশ্চাতে মূখ্য ভূমিকা পালন করে মস্তিষ্কের উপর মাদকের জৈবরাসায়নিক প্রভাবের ধারণা এবং একইসঙ্গে মানবশরীরের উপর মাদকের যে ক্ষতিকর প্রভাবগুলো আছে সেগুলোর ব্যাখ্যায় শুধুমাত্র ফার্মাকোলজিক্যাল কম্পনেন্ট বা ঔষধি উপাদানের ফলাফল বিশ্লেষণকে বিবেচনায় রাখা হয় বলে। কার্যত এই ধারণাগুলো সত্য হলেও আসলে প্রকৃত বিষয়টিকে পুরোপুরি জানতে-বুঝতে, ব্যাখ্যা করতে ধারণাগুলো যথেষ্ট নয়। তাই মাদকাসক্তির মূল কারণকে সনাক্ত করতে আমাদের প্রাসঙ্গিক আরো কিছু বিষয় সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখা প্রয়োজন।

মানব ইতিহাসে মাদকাসক্তির বিষয়টি কোন পর্যায়ে বিস্তার লাভ করেছে সেটা খুঁজে বের করতে গিয়ে কানাডার বৃটিশ কলম্বিয়ার সাইমন ফ্রেজার ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ব্রুস দেখলেন, মানুষকে যতবার তার বন্ধন থেকে ছিন্ন করা হয়েছে, ঠিক ততবারই মাদকাসক্তির প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। তাঁর ভাষ্যমতে, ডিজলোকেশন বা স্থানচ্যুতির একটা অনুভূতি মানুষকে মাদকাসক্তির দিকে নিয়ে যায়। এই স্থানচ্যুতি কেবল স্থানিক নয় বরঞ্চ কালিক প্রেক্ষাপটে ভিন্ন ভিন্ন সমাজ-সংস্কৃতির মানুষদের জন্য তা ভিন্নভাবে হতে পারে। ব্রুস উদাহরণ দেন

উত্তর আমেরিকার আদিবাসীদের কাছ থেকে তাদের ভূমি ও সংস্কৃতি কেড়ে নেওয়া হলো—তারা গণহারে অ্যালকোহল আসক্তিতে পড়লেন। আঠারো শতকে দরিদ্র ইংরেজদের তাদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করে অজানা-অচেনা শহরে পাঠানো হলো আর তারা জিন ক্রেইজে আক্রান্ত হলেন। ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে আমেরিকার গ্রামীণ অঞ্চলের বাজার ও ভর্তুকি হ্রাসের সাথে বাড়ল মেথাস্ফিটামিন (ইয়াবা) আসক্তি।
সুতরাং ব্রুস মনে করেন, ‘আজকের দিনে মাদকাসক্তি বিস্তারের কারণ হলো অতিব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী বা হাইপারইন্ডিভিজুয়ালিস্টিক, আতঙ্কিত ও সংকটগ্রস্ত এই সমাজ বেশিরভাগ মানুষকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে আলাদা বা বিচ্ছিন্ন করে ফেলে৷ মানুষ এই একটানা বিচ্ছিন্নতা থেকে মুক্তি খোঁজে। আসক্তির মধ্যেই তারা সাময়িক মুক্তি খুঁজে পায়৷ কারণ এর মাধ্যমে সে তার অনুভূতিগুলোর হাত থেকে মুক্তি পায়, অনুভূতিগুলো ভোঁতা করে ফেলে এবং একটা পরিপূর্ণ জীবনের বদলে নেশাগ্রস্ত জীবন খুঁজে পায়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে ব্রুসের এই পর্যবেক্ষণ খুবই প্রাসঙ্গিক। পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের মাদকগ্রহণকারীদের সিংহভাগই বয়সে যুবক-তরুণ। যার মধ্যে আবার বেকার আর ছাত্রদের সংখ্যায় বেশি। আমরা আমাদের চারপাশে একটু খেয়াল করলেই দেখতে পাবো, আমাদের যুব সমাজে বিদ্যমান মাদকাসক্তির কারণগুলো ব্রুসের চিহ্নিত কারণগুলোর চেয়ে অভিন্ন নয়। বিশেষ করে তাঁর ‘অতিব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদী’ ‘আতঙ্কিত’ ও ‘সংকটগ্রস্ত’ শব্দগুলো যেন আমাদের যুব সমাজের মাদকাসক্ত হওয়ার মনস্তাত্ত্বিক দিকটিকেই উন্মোচন করছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের মাদকাসক্ত সমাজের জন্য ব্রুসের এ কথাগুলো সত্য।
তাই মোটাদাগে বলা যায় যে, মাদকাসক্তির জৈবরাসায়নিক ভিত্তি মানুষের মাদকাসক্ত হওয়ার মূল কারণ নয়। তাহলে মূল কারণ কী?

মাদকাসক্তির কারণ নানাভাবে হাজির আছে আমাদের সমাজে। বলা চলে পরিবেশই সেখানে প্রধান উদ্দীপক হিসেবে কাজ করছে। তাই পরিবেশকে কেন্দ্রে রেখে কারণগুলোকে পর্যায়ক্রমে সূচিত করলে আমরা এর একটা সার্বজনীন চিত্র পাবো। যেটা আমাদের মাদকাসক্তির মূল কারণকে বুঝে উঠতে সাহায্য করবে। 

মাদকাসক্তির পরিবেশগত কয়েকটি কারণ...
মানুষের ব্যক্তিত্বের সাথে মাদকাসক্তির সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ মাদকের ব্যবহার যেমন ব্যক্তির আচরণকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। ঠিক তেমনি মাদকদ্রব্য ব্যবহারের প্রতি ব্যক্তিত্বের কিছু সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যও ব্যক্তিকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই দেখা যায়, ব্যক্তিত্বজনিত নানা মানসিক সমস্যা ভুগছেন এমন ব্যক্তিদেরই মাদক গ্রহণের প্রবণতা তূলনামূলক বেশি। আর কে না জানে ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের বিকাশে মূল ভূমিকা পালন করে তো এই পরিবেশই। এক্ষেত্রে জিনগত প্রভাব খুব অল্পই থাকে।

গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের নানাবিধ অনুসঙ্গ জড়িয়ে আছে এই মাদকাসক্তির পেছনে। যেখানে বলা হচ্ছে— সঙ্গদোষ, পারিবারিকভাবে আরোপিত মানসিক চাপ ও সমাজে বিদ্যমান প্রতিযোগিতার দর্শন যুব সমাজকে মাদকদ্রব্য গ্রহণের প্রতি উৎসাহিত করছে।
এসবের সাথে পরিবেশগত আরো একটি কারণ ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। আর সেটা হলো মাদকের সহজলভ্যতা। এই সহজলভ্যতা শুধুমাত্র বাংলাদেশের একক সমস্যা নয়। এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। অন্যদিকে আবার আন্তর্জাতিক মাফিয়াগোষ্ঠী আর সাম্রাজ্যবাদী শাসকেরা এই সমস্যাকে আরো ঘনীভূত করতে সদা তৎপর । কেননা এর সাথে যুক্ত রয়েছে ভূ-রাজনৈতিক অর্থনীতি। মোটকথা, পরিবেশে মাদকব্যবসায়ীরা এমন এক কৃত্রিম বাস্তুতন্ত্র গড়ে তুলেছে, যা মাদকের বিস্তারে প্রতিনিয়ত পুষ্টি যোগাচ্ছে। তাই এই পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে তুলতে আমাদের সবাইকে যার যার স্থান থেকে সম্মিলিতভাবে এর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। মাদকের এই সর্বনাশী আগ্রাসনের মোকাবিলায় সামগ্রিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

যুব সমাজের একটা বড় অংশের কাছে ধূমপান, মদ্যপান ইত্যাদি ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। এসব ছাড়া যেন পার্টি-আড্ডার জমেই না। অনেকেই আবার এটাকে স্রেফ বিলাসিতা হিসেবেই নেয়। কিন্তু এই বিলাসিতা যে একসময় তাদের আসক্তিতে পরিণত হয়, সেটা খুব কম যুবক-তরুণেরাই বুঝতে পারে। কিন্তু তাদের এই বোধ আদতে তখন আর কোনো কাজে আসে না। কেননা তাদের আসক্তি ঐ সময়ে এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, এর থেকে বেরিয়ে আসাটা তাদের জন্য রীতিমতো দুঃসাধ্য ব্যাপার হয়ে উঠে।

বর্তমান সময়ে নাটক কিংবা সিনেমা দেখে না এমন যুবক-তরুণ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর বটে। আর এই নাটক-সিনেমায় মাদককে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়, দর্শক মানসে তার প্রতিক্রিয়ায় যে অভিঘাতের সৃষ্টি হয়, তা নিঃসন্দেহে ক্ষতিকর। যেখানে মাদককে দেখানো হয় আনন্দ আর ফূর্তির উপলক্ষ হিসেবে, নিজের একাকিত্বকে উপভোগ্য করে তুলার উপায় হিসেবে কিংবা কখনো কখনো ডিপ্রেশন থেকে মুক্তির দিশা হিসেবে। আর এটা করা হয় উদ্দেশ্যমূলকভাবে। রীতিমত প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে। এক্ষেত্রে আবার সেন্সরশিপ নামে কর্তৃপক্ষের অদ্ভুত এক মাদকবিরোধী সার্কাসও আমরা দেখি!
আর এমন একটা পরিবেশে বসবাস করে মাদকমুক্ত সুস্থ-স্বাভাবিক জীবন-যাপন করা আমাদের যুবক-তরুণদের উল্লেখযোগ্য একটা অংশের জন্য বড়ই কঠিন!

যাইহোক, মাদকাসক্তির কার্যকারণের পরিবেশীয় গুরুত্ব কি তা বুঝতে মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ব্রুসের করা একটা পরীক্ষার কথা এখানে সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। বিষয়টি বাস্তবিক অর্থে কেমন তা ব্যাখ্যা করতে ব্রুস ইঁদুর নিয়ে একটি পরীক্ষা করেন। উদ্দেশ্য ছিল মাদকাসক্তির ফার্মাসিউটিক্যাল থিওরির পক্ষে যেসব প্রমাণ পাওয়া যায় তার সত্যতা যাচাই করা। প্রচলিত এসব প্রমাণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ইঁদুর নিয়ে করা কিছু জনপ্রিয় পরীক্ষা। যেখানে দেখানো হয়েছে যে, মাদকের রাসায়নিক তাড়না একটি ইঁদুরকে এতটাই কাবু করে ফেলে যে, আমৃত্যু ইঁদুরটি মাদকের সেই প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারে না। বদ্ধ খাঁচায় থেকে ক্রমাগত মাদক সেবনের ফলে একপর্যায়ে ইঁদুরটি মৃত্যুবরণ করে।
ব্রুসের কাছে এই পরীক্ষা অস্বাভাবিক মনে হলো। তাই তিনি পরীক্ষাটি একটু ভিন্নভাবে করতে চাইলেন। ব্রুস একই পরীক্ষা করলেন দুইভাবে। তিনি পরীক্ষার জন্য দু’টি ক্ষেত্র তৈরি করলেন। যেগুলোর পরিবেশ ছিলো সম্পূর্ণ বিপরীত। অর্থাৎ প্রথম ক্ষেত্রে ইঁদুরকে তিনি প্রচলিত পরীক্ষার মতো নিঃসঙ্গ রাখলেন। সাথে দিলেন শুধু মাদকদ্রব্য। আর দ্বিতীয় ক্ষেত্রকে তিনি বানালেন ‘র‍্যাট পার্ক’। একটা ইঁদুরের সম্ভাব্য যতোরকম চাহিদা থাকতে পারে, ব্রুস সেই চাহিদা পূরণের সবরকম বন্দোবস্ত করলেন সেখানে। ফলাফলও পেলেন হাতেনাতে।
ব্রুস শুধু ইঁদুরের উপর পরীক্ষা চালিয়েই ক্ষ্যন্ত হননি। মানুষের ক্ষেত্রে এই পরীক্ষা কতটুকু কার্যকর সেটাও তিনি খতিয়ে দেখেছেন। আর সেটা করেছেন ভিয়েতনাম যুদ্ধ ফেরত মাদকাসক্ত মার্কিন সৈনিকদের অবস্থাকে পর্যবেক্ষণ করে।
এই সবকিছু জেনে ব্রুস একটা তত্ত্ব দাঁড় করাতে শুরু করেন— যে তত্ত্ব মাদকাসক্তি সম্পর্কে আমাদের এযাবৎ যত ধারণা আছে তার বিপরীত শিক্ষা দেয় কিন্তু একমাত্র এর মাধ্যমেই বাস্তব অভিজ্ঞতার ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব হবে। যদি আপনার পরিবেশ ইঁদুরের ঐ র‍্যাট পার্কের মতো হয়— নিরাপদ ও সুখী একটি সমাজ যেখানে স্বাস্থ্যকর বন্ধন তৈরি ও আনন্দদায়ক কর্মকান্ড করা যায়, তাহলে আপনার মাদকাসক্ত হওয়ার বিশেষ কোনো ঝুঁকি থাকবে না। আপনার পরিবেশ যদি ইঁদুরের খাঁচার মতো হয়, যেখানে আপনি নিঃসঙ্গ, ক্ষমতাহীন ও উদ্দেশ্যহীন— তাহলে আপনার ঝুঁকি থাকবেই।

মাদকাসক্তি প্রতিকার-প্রতিরোধের গতিপ্রকৃতি...
মাদকাসক্তি প্রতিকার-প্রতিরোধের আলোচনার ক্ষেত্রে আমি মূলত দু’টি দিককে বিবেচনার কেন্দ্রে রেখেছি। ১. ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ। ২. রাষ্ট্র। আশা করি এই বিবেচনা আমাদের মাদকাসক্তি প্রতিরোধের গতিপ্রকৃতি বুঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে।

‘মাদকাসক্তি’ প্রতিকার-প্রতিরোধে ও নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের মূল প্রবণতাগুলো যেমন হতে পারে—

মাদকাসক্তি একটি ক্রনিক রিলাপসিং ডিসঅর্ডার। এটি যেহেতু মস্তিষ্কের রোগ। তাই এর চিকিৎসাও হতে হবে সেভাবে। অর্থাৎ এর চিকিৎসা হবে বহুমাত্রিক, সমন্বিত আর দীর্ঘমেয়াদী। শুধুমাত্র সাধারণ ওষুধের সাহায্যে এই রোগ থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। তাই এর পাশাপাশি মাদকাসক্ত ব্যক্তির মানসিক চিকিৎসাও সমানভাবে জরুরি। যেটা শুরু হতে পারে ব্যক্তিগতভাবে কিংবা পারিবারিকভাবে। পরবর্তীতে পুনঃ আসক্তি প্রতিরোধ প্রোগ্রামের মাধ্যমে অথবা গ্রুপ থেরাপি/থেরাপিউটিক কমিউনিটি, মোটিভেশন এনহেন্সমেন্ট থেরাপি ইত্যাদির সাহায্যও নেয়া যেতে পারে।
আমরা জানি, মাদকাসক্তি একটি প্রতিরোধযোগ্য ব্যাধি। তাই এটির প্রতিরোধে ব্যক্তি থেকে শুরু করে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সবাইকেই যার যার ভূমিকা যথাযথভাবে পালন করা চাই।

মাদকাসক্তি নিরাময়ে একটি পরিবার যেভাবে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখতে পারে, তেমনিভাবে এর প্রতিরোধেও ভূমিকা রাখতে পারে। দৃঢ় পারিবারিক বন্ধন এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসাবে কাজ করে। কারণ এইরকম ব্যক্তিগত সমস্যা সমাধানে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়াটা পোক্ত হওয়া চাই। কেননা এতে আলাপ-আলোচনাটা খোলামেলাভাবে করা যায়। সমস্যার গভীরতা ও গুরুত্ব নিরূপণ করা যায়। যার কারণে মাদকাসক্ত ব্যক্তির তত্ত্ববাধান করতে সুবিধা হয় পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের। এছাড়াও মাদকাসক্তি নিরাময়ে নতুন করে পারিবারিক রীতি-রেওয়াজ প্রতিষ্ঠা করতে, প্রয়োজনে পরিবর্তন করতে এই পারিবারিক গঠনতন্ত্র ব্যাপক ভূমিকা রাখে।

মাদকাসক্তি নিয়ন্ত্রণে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। যুব সমাজের একটা বড় অংশ মাদকবিষয়ক প্রাথমিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা যেহেতু এখান থেকেই লাভ করে। তাই স্কুল-কলেজ পর্যায়ে ছাত্র-ছাত্রীদের একটা নির্দিষ্ট সময় নজরদারিতে রেখে, তাদের আচরণবিধি পর্যবেক্ষণ-বিশ্লেষণ পূর্বক কারো আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে কর্তৃপক্ষের সেই অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নিতে আন্তরিক ও উদ্যোগী হতে হবে। ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে মাদকবিরোধী মনোভাব তৈরি করতে হবে। শুধু মাদক নয়, এরকম যেকোনো ধরণের হঠকারী-আত্মঘাতী বিষয়ে তারা যাতে ‘না’ বলতে শেখে, সেই বিষয়েও তাদের দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হতে হবে। একইসঙ্গে সমাজ-ধর্মের প্রতি ব্যক্তি মানুষের যে দায়বদ্ধতা, তার যথোপযুক্ত শিক্ষাও তাদের দিতে হবে। সর্বোপরি বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় সমাজে মাদকবিরোধী গণসচেতনতা তৈরি করতে হবে।
আর শেষোক্ত এই কাজটা করতে হবে সবাইকেই।

যুব সমাজকে মাদকাসক্তির হাত থেকে মুক্ত করতে চাইলে আমাদের কাজ শুরু করতে একদম প্রথম থেকেই। শৈশব-কৈশোর থেকেই।যারা এই সময়টাতে বিভিন্ন ধরণের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার মুখোমুখি হয়, সেটা হতে পারে যেকোনো ধরনের শারীরিক-মানসিক কিংবা যৌন নির্যাতনের ঘটনা। এবং এটা হতে পারে পরিবারের কোনো সদস্য দ্বারা, নিকটাত্মীয় দ্বারা অথবা বহিরাগত-অপরিচিত কারো দ্বারা। গবেষণা বলছে, শৈশব-কৈশোরে যারা এই ধরণের নির্যাতনের শিকার হয়েছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারাই পরবর্তীতে মাদকের দিকে ঝুঁকে গেছে। ধীরে ধীরে এবং একটা সময় মারাত্মকভাবে। তাই আমাদের অবিভাবকদের এইসব ব্যাপারগুলো যাতে না ঘটে সেক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। এরপরও যদি এরকম কোনো ঘটনা কারো সাথে ঘটে যায় তাহলে তার জন্য যথাযথ বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। আবশ্যিকভাবে। এতে ভবিষ্যতে ভিক্টিমের মাদকাসক্ত হওয়ার ঝুঁকিটা কমে যাবে। একইসঙ্গে শৈশব-কৈশোরের শারীরিক-মানসিক পরিবর্তনজনিত নানা আচরণগত জৈবিক সমস্যাবলি। যেমন— কনডাক্ট ডিজঅর্ডার, অপজিশনাল ডিফায়ান্ট ডিজঅর্ডার, অতিচঞ্চলতা রোগ ইত্যাদির লক্ষণ ও তার মনোদৈহিক প্রভাব সম্পর্কে অবিভাবকদের অল্পবিস্তর ধারণা থাকাটা বাঞ্ছনীয়। সেক্ষেত্রে ভবিষ্যতে কোনো ব্যক্তির দীর্ঘ মেয়াদে বাধ্যতামূলক মাদকসেবি হওয়ার সম্ভাবনা অধিকাংশ ক্ষেত্রে কমে যায়।

রাষ্ট্রে বিদ্যমান প্রতিরোধের চেহারা—

মাদকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের যে অনন্ত যুদ্ধ; তা মূলত প্রকারান্তরে জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। আর এই জনগণ যে আসলে গরীব জনগণ সেটা তো বলাই বাহুল্য। মাদকের বিস্তার রোধে যেসব রাষ্ট্রীয় তৎপরতা আমরা দেখতে পাচ্ছি, তার সম্ভাবনা ও পরিণতি কেমন হতে পারে তার নমুনা আমরা নিকট অতীতেই দেখেছি। তারপরও আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টা পুরোপুরি বুঝা সম্ভব না। তাই মাদক নির্মূলে আমাদের পাশ্ববর্তী দেশগুলোর যে তৎপরতা এবং এক্ষেত্রে তাদের সফলতা-ব্যর্থতার ইতিহাস ও অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। সেই অনুযায়ী উত্তরণের পথ ও পন্থা আমাদের নিজেদেরকেই তৈরি করতে হবে কিংবা খুঁজে নিতে হবে। আর এই কাজ যেহেতু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর, তাই মাদক পাচার ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে এদেরকে আরো সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারকে প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত উন্নয়নে অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর সক্ষমতা-কার্যকারিতা-বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে যথেষ্ট মনোযোগী হতে হবে।

এছাড়া শুধুমাত্র রাষ্ট্রের মাদক বিরোধী ইমেজ তৈরি করতে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত সেইসব দেশের অন্ধ অনুকরণ আমাদের জাতীয় জীবনে কি ভয়াবহ ভোগান্তি ও বিপদ ডেকে আনতে পারে তা কলম্বিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে সহজেই অনুমেয়। এখানে কলম্বিয়ার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট সিজার গ্যাভিরিয়ারের বক্তব্যটি প্রণিধানযোগ্য—“...আসলে আমরা বিশ্বাস করি না যে সামরিক সরঞ্জাম, পুলিশি নিপীড়ন আর বড় বড় জেলখানার মাধ্যমে মাদক সমস্যার সমাধান করা যাবে। জনস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার উন্নয়ন, দূর্নীতি—বিশেষত অর্থপাচারবিরোধী পদক্ষেপ আরও শক্তিশালীকরণ এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগের মাধ্যমেই প্রকৃতপক্ষে মাদকের চাহিদা ও সরবরাহ কমানো যেতে পারে।”

তাই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সত্যিকার অর্থে দেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করতে হলে রাষ্ট্রের সরকারকে এক্ষেত্রে সৎ হতে হবে। মাদক নির্মূলে সরকারের সর্বোচ্চ আন্তরিক প্রচেষ্টা থাকতে হবে। তবেই জনমানসে শান্তি ফিরবে। নিরপরাধ মানুষদের ভোগান্তি কমবে। একই প্রেক্ষাপটে হাজির থাকা বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডসহ সাধারণ মানুষদের উপর আরো যেসব রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন চালু আছে তা হ্রাস পাবে। রাষ্ট্র মাদক নির্মূলে সমর্থ হবে।

মাদকাসক্তি নিরাময়ে ধর্মীয় বিবেচনা—

ফিতরাতের কারণে মানুষের মনে ধর্মের একটা আধ্যাত্মিক প্রভাব সর্বদা ক্রিয়াশীল। যেকোনো মানুষের শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি তার আত্মিক প্রশান্তিরও প্রয়োজন হয়। তাই মাদকাসক্তি নিরাময়ে অন্যান্য চিকিৎসার সাথে ধর্মীয় বিবেচনাও গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ চিকিৎসার ক্ষেত্রে এই ধর্মীয় প্রভাব পরিপূরক হিসেবে কাজ করে।

মাদকাসক্তি প্রতিকারে ইসলামের ঐতিহাসিক ভূমিকা প্রাসঙ্গিকভাবে এখানে স্মরণ করা যেতে পারে। প্রাক-ইসলামি যুগে আরবীয় সংস্কৃতিতে মদ্যপান স্বাভাবিক ছিল। এমনকি ইসলামের প্রাথমিক যুগেও তা বৈধ ছিল। মাদক বিষয়ক আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার পরম্পরা খেয়াল করলে এবং একইসঙ্গে আয়াতগুলোর শব্দাবলি, বাক্যের ভঙ্গিময়তা আর অর্থের দিকে একটু লক্ষ্য করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়। নানা ঘটনার প্রেক্ষিতে মহান আল্লাহ মানুষের উপর মাদকের যে প্রভাব তার সাথে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)কে প্রাথমিকভাবে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন এভাবে—

قال الله تعالى: ﴿ يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ قُلْ فِيهِمَا إِثْمٌ كَبِيرٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَإِثْمُهُمَا أَكْبَرُ مِنْ نَفْعِهِمَا... ﴾ [البقرة : 219]

“তারা আপনাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করছে। আপনি বলুন, এ দু’টির মধ্যে রয়েছে মহাপাপ এবং মানুষের জন্য কিছুটা উপকার। তবে এগুলোর পাপ উপকারিতা অপেক্ষা অনেক বেশি।” (সূরা বাকারাহ্ : ২১৯ )

মাদক প্রধানত মস্তিষ্কের সেই অংশের (অগ্রমস্তিষ্ক) উপরই প্রভাব বিস্তার করে, মস্তিষ্কের যে অংশ মানুষের চিন্তা, বুদ্ধি, ইচ্ছাশক্তি, উদ্ভাবনীশক্তি প্রভৃতি উন্নত মানসিক বোধের নিয়ন্ত্রণ করে। তাই দেখা যায়, যেসব মানুষ কোনো নির্দিষ্ট উপলক্ষে তথা অনিয়মিতভাবে মাদক গ্রহণ করে তাদের মস্তিষ্ক একটা নির্দিষ্ট সময় পর মাদকের সেই প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারলেও মাদকাসক্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সময়ের অভাবে মস্তিষ্ক সেই প্রভাব কাটিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে না। ফলে মস্তিষ্ক তার নির্ধারিত কাজ যথাযথভাবে করতে সমর্থ হয় না। তাই এক পর্যায়ে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়।
মহান আল্লাহ মাদকের এই ভয়াবহতা ও তার নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ যুগপৎভাবে আমাদের স্বরণ করিয়ে দিয়েছেন যেভাবে—

قال الله تعالى: ﴿ إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ فَهَلْ أَنْتُمْ مُنْتَهُونَ ﴾ [المائدة :91].

“শয়তান চায় মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরের মাঝে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চারিত করে দিতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামায থেকে তোমাদেরকে বিরত রাখতে, অতএব তোমরা কি (এসব) ছাড়বে?” (সূরা মায়িদাহ্ : ৯১ )

মাদকাসক্তি প্রতিরোধেও ইসলামের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মাদককে নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে ইসলামের পর্যায়ক্রমিক অবস্থান পর্যবেক্ষণ করলেই আমরা দেখতে পাবো, ইসলামি শারীয়াহ্তে মাদক সংক্রান্ত বিধিনিষেধ আরোপ করার ক্ষেত্রে মানুষের স্বভাবজাত বিষয়গুলোকে খুবই গুরুত্বের সাথে দেখা হয়েছে। অর্থাৎ মাদকের ইতিবাচক-নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সর্বপ্রথম সবাইকে জানানো হয়েছে। সকলের সম্যক অবগতির পরই পরবর্তীকালে চূড়ান্ত বিধান দেওয়া হয়েছে তথা নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং ঘৃণ্য বস্তু হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে।
ইসলামের দৃষ্টিতে মাদকের যেকোনো ব্যবহার কতোটা নিকৃষ্টতর কাজ, নিম্নোক্ত হাদিস থেকেই তা বোধগম্য হওয়ার কথা। এই প্রসঙ্গে ইরশাদ হচ্ছে—

عن ابن عمر بن الخطاب رضي الله عنهما قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : ”لَعن اللهُ الخمرَ، وشارِبَها، وساقِيَها، وبائِعَها، ومُبتاعَها، وعاصِرَها، ومُعتَصِرَها، وحامِلَها، والمحمولةَ إليه، وآكِلَ ثَمنِها.“
(سنن أبي داود/5091)

আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেন— “মদ, যে ব্যক্তি পান করে, যে তা পান করায়, যে তা বিক্রি করে, যে তা ক্রয় করে, যে তা তৈরি করায়, যে তা তৈরি করে, যে তা বহন করে, যার জন্য তা বহন করা হয় এবং মূল্য ভক্ষণ করে, সকলের প্রতি আল্লাহ্ তা‘আলা অভিশাপ দেন।” (সুনানে আবু দাউদ/৫০৯১)

মোদ্দাকথা, মাদকাসক্তির প্রতিকার-প্রতিরোধে ইসলামি পথ ও পন্থা অনুসরণ করা গেলে তথা মানুষের সাথে ধর্মের আধ্যাত্মিক সংযোগ ঘটাতে পারলে কিংবা তাদের মাঝে ধর্মীয় চেতনা সৃষ্টি করতে পারলে নিঃসন্দেহে সার্বিকবিচারে মাদকাসক্তি থেকে মুক্তি পাওয়া সহজ হবে।

উপসংহারের পরিবর্তে...
বাংলাদেশের যুব সমাজের মাদকাসক্তির কারণ ও প্রতিকারের বিষয়ে ধারণা পেতে এই দীর্ঘ আলোচনা যথেষ্ট হবে বলে মনে করি। প্রেক্ষিতে যেহেতু বাংলাদেশ তাই মাদক বিষয়ে বর্তমান বিশ্বের সাম্প্রতিক স্বরূপ নিয়ে আলোচনা করাটা বাহুল্য বলেই মনে হয়েছে। বিশ্ববাস্তবতা বুঝতে আলোচনটা যদিও যুক্তিযুক্ত ছিল। এক্ষেত্রে তাই শুধুমাত্র ইঙ্গিত দিয়েছি।
অভ্যন্তরীণ নানা সমস্যায় জর্জরিত তৃতীয় বিশ্বের একটি ক্ষুদ্রতম দেশ বাংলাদেশ। আর যেহেতু একটি দেশের যুবক-তরুণরাই সে দেশের মূল চালিকাশক্তি। সেহেতু বলা যায়, দেশের এই যুবক-তরুণদের হাতেই আমাদের ভবিষ্যতের বাংলাদেশ। এবং একইসাথে দেশের সম্পদ-সাহস-অর্জন ও সঞ্চয়। দেশ ও জাতি গঠনে এদের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। তাই এই যুবশক্তির মাদকের অন্ধকারে বিলীন হয়ে যাওয়াটা মোটেও কাম্য নয়। সুতরাং সার্বিকভাবে পতনোন্মুখ এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে আশু বিপদ থেকে বাঁচাতে, একটুখানি আলো অথবা মুক্ত বাতাসের খোঁজ দিতে আমাদের সবাইকেই এগিয়ে আসতে হবে।

ঋণ স্বীকার...
লেখাটি তৈরি করতে নিম্নোক্ত বই এবং ওয়েবসাইটগুলোর সাহায্য নেওয়া হয়েছে।

বই –
১. আল-কোরআন।
২. সুনানে আবু দাউদ।
৩. কর্তৃত্ববাদ, আধিপত্য ও মুক্তির দিশা : বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা — গ্রন্থনা ও ভাষান্তর : কল্লোল মোস্তফা, সংহতি।

ওয়েবসাইট –
1) https://bit.ly/2BrASiA
2) https://bit.ly/3fWzgfC
3) https://bit.ly/32L1s16
4) https://bit.ly/39m16zf

রচনাকাল — ২৬/০৭/২০২০ইং

Saturday, 9 May 2020

গোসলের পুকুরসমূহ



কিছুদিন আগে মেহেদী উল্লাহর একটা লেখা পড়েছিলাম সমকালের কালের খেয়ায়। ‘ফলিত স্বপ্নের বাসনা’ নামে। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘গোসলের পুকুরসমূহ’ লেখার নেপথ্যকাহিনি জানতে পারি সেখান থেকেই। মূলত তারই ধারাবাহিকতায় অনেকটা কৌতূহলবশত উপন্যাসটা পড়তে শুরু করি।

১.
এই উপন্যাসটা পড়েছি অনেকটা গল্পের বই পড়ার মতো করে। থেমে থেমে। উপন্যাসের কাহিনির শুরু ঘোরগ্রস্থ একজন কথকের রহস্যময় কথামালা দিয়ে, এভাবে —
গ্রামের গোসলের নিজস্ব নিয়মে একটা লুঙ্গি ও গামলাকে পাড়ে ঘাসের উপর এবং সাবানের কেসটাকে ঘাটের কাছে থুয়ে আমি প্রথমে পানিতে ডান পা বাড়ালাম। বাম পা নামানোর আগেই ওদের দিকে চোখ গেল। আঁতকে ওঠার মতো পরিস্থিতি। এত বছর বাদে একসঙ্গে সবাইকে পেয়ে যাব ভাবিনি। কেউ সাঁতার কাটছে, কেউ হাঁটু মাজন করছে, কেউ কোমরপানিতে দাঁড়িয়ে আঁচল বিছাচ্ছে, কেউ ডুব দিচ্ছে, কুলকুচি করছে, কে-বা পা দিয়ে তেল খোঁজার চেষ্টারত, কেউ তালুতে পানি তুলে ছুড়ছে ওপরে; প্রত্যেকেই কোনো না কোনো ভঙ্গিতে। ওরা বারো জন। পুকুরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। সত্যি আমি আশা করিনি। আমাকে দেখে তারা নিজ নিজ ভঙ্গিমা মুলতবি করে সমস্বরে আহ্বান করতে থাকল, ‘আসো, আসোও, আসোওও না।’ যেন আমি আসব, ওরা জানত। আর এলেই ওদের সঙ্গে গোসলে ডাকবে, এটাও ঠিক করে রাখা৷ আমার ভয় বা অপ্রস্তুত হওয়ার কিছু নেই। আমি স্থলে ওদের সবার সঙ্গ পেয়েছি। জলে এই প্রথম। প্রেম পৃথিবীর সর্বত্র এক, স্থল কিংবা জলে যেখানেই হোক। ওরা সবাই আমার প্রেমিকা।  বিভিন্ন সময়ের, জীবনে প্রথম পুকুরে গোসল করার সময় থেকে শুরু করে।
জীবন পথের সংক্ষিপ্ত ভ্রমনে তার প্রত্যাশা, আকাঙ্খা ও সম্ভাবনার গল্পে আমরা দেখতে পাই, শৈশব-কৈশোরের চোখে দেখা গোসলের পুকুরসমূহকে সময়জ্ঞানের সাথে মিলিয়ে বর্তমান সময়ে বসে আত্মমগ্ন হয়ে একজন প্রেমিক স্মৃতির ঝাঁপি খুলে হাতড়ে বেড়াচ্ছে তার স্বপ্নকে। পাঠকদের স্বপ্ন-কল্পনা-বাস্তবতার মিলিত এক জগতে নিয়ে যেয়ে সে বলে যাচ্ছে প্রেমিকাদের নিয়ে তার প্রেমকালীন সময়ের কথা, বিচ্ছিন্নতার কথা। একই সময়ে জীবন-যাপন করেও অনিবার্য নিয়তি আর বাস্তবতার ফাঁদে আটকা পড়া মানুষের কথা।

২.
গোসলের পুকুরসমূহ, বিবাহস্বপ্নের কনে, রেণু বালার ব্যস্তগলার দিনগুলিতে, উড়ির চরের আয়নাবুড়ি ও মঞ্জুরির ড্রেসিংটেবিল, সর্পবংশের শেষদিন, দাগ, মনসামঙ্গল, কোন পরান বিদ্যাশ হইলায়, ইচ্ছামৃত্যু হবে তুমি, মেডেন/মেডেন বিহীন, ক্ষেত-খামার,গৃহপালিত পশু তথা কৃষি,ভাষা ও উন্নয়ন অধ্যায়ন প্রেক্ষিত প্রেম ও পরিবার, এতিমখানার ইলম, আক্ষরিক, মাতাই পূখিরী, হোরাজের নন্দনতত্ত্ব, আমার অসুখ।আই মিন আমি অসুখী।
‘গোসলের পুকুরসমূহ' উপন্যাসটি এই ষোলো অধ্যায়ে লেখা। অধ্যায়গুলোর ব্যতিক্রমী গদ্যভাষার জন্য পাঠক এর আঙ্গিক নিয়ে খানিকটা দ্বিধান্বিত হবেন।

মূলত এই উপাখ্যানগুলোই এই উপন্যাসের উপজীব্য। যেগুলো কোনো নির্দিষ্ট কাহিনির গন্ডিতে আবদ্ধ নয়। জীবনের বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার অন্তর্গত প্রেমবিষয়ক নানা বোধের ধারাবাহিক বর্ণনা মাত্র। তবে গল্পগুলোর চারপাশটা তেমন গোছানো নয়। তাই কোনো কোনো আখ্যানে আমরা দেখি, লেখক বিষয়ের চেয়ে আঙ্গিকের দিকে অতিরিক্ত মনোযোগী হওয়ার ফলে নানা জায়গায় অনেক গল্পই হারিয়ে গেছে দৃষ্টিকটুভাবে।

৩.
এটি নিছক কোনো প্রেমকাহিনি নয়। এখানে যদিও প্রায় অর্থহীন, প্রয়োজনহীন কার্যকলাপ ও কথাবার্তা আছে অনেক। কিন্তু একইসঙ্গে আছে পারিপার্শ্বিক ঘটনাবলীর অভিঘাতে সৃষ্ট জটিল সব মনোজাগতিক সংকটের নিরাসক্ত আর নির্মোহ বিবরণও। অবশ্য নানা জায়গায় তার এই বর্ণনাভঙ্গি কখনো কখনো ক্লান্তিকর।

জনজীবনে প্রবাহমান নানা মিথের উল্লেখযোগ্য ব্যবহার দেখা যায় ‘মনসামঙ্গল’ ও ‘সর্পবংশের শেষদিন’ প্রভৃতি পর্বে।

বিষয় আর প্রকরণের বৈচিত্র্যে ভরা এই উপন্যাসের বিশাল অংশজুড়ে আছে প্রচলিত লোকাচার, লোকবিশ্বাস ও সংস্কারের নানা গল্প।

কথক ভঙ্গিতে থাকা চরিত্রটির যে গভীর দার্শনিক বোধ জীবন ও জগৎ সম্পর্কে; তার সাথে ব্যাখ্যাতীত অনেক বিষয়কে, ব্যাখ্যাহীন মানবজীবনের অনেক সত্যকে সে উন্মোচন করে গেছে একের পর এক। যা পাঠককে ভাবায়। কাহিনির প্রেক্ষাপটে এমন অনেক তাৎপর্যময় ঘটনাবলীর সন্নিবেশও আমরা দেখি উপন্যাসের জায়গায় জায়গায়। পাশাপাশি উপন্যাসের কাহিনির দৃষ্টিগ্রাহ্য পরিবর্তনকে মূর্ত করে তুলেছে ‘কোন পরান বিদ্যাশ হইলায়, ক্ষেত-খামার,গৃহপালিত পশু তথা কৃষি,ভাষা ও উন্নয়ন অধ্যায়ন প্রেক্ষিত প্রেম ও পরিবার’  আর ‘মাতাই পূখিরী’ ইত্যাদি পর্ব।

৪.
ভাষার অদ্ভুত আচরণ, চরিত্র ও কাহিনির পরম্পরা নির্মাণে লেখকের অদ্ভুত উদাসীনতা, গল্প বলার ভঙ্গি একইসঙ্গে  চরিত্রদের কৌতুককর নানা অভিব্যক্তি যেভাবে  চিত্রিত হয়েছে এই উপন্যাসে; সব মিলিয়ে তা পাঠক মনে একটা অন্য রকম অনুভূতির সঞ্চার করবে নিঃসন্দেহে।

৫.
এককভাবে উপন্যাসের বিষয়বস্তুকে সনাক্ত করা আমার মতো পাঠকদের জন্য অবশ্য একটু কঠিন। তারপরও সংক্ষেপে বললে, স্বপ্ন নিয়ে নাগরিক মানুষ ও তাদের জীবনের যে পৌনঃপুনিকতা, এদের জীবনবোধের যে গভীর উপলব্ধি; তারই চিত্রায়ণ করেছেন লেখক কুশলতার সঙ্গে। সেখানে ইঙ্গিতে ও ইশারায় তিনি এমন সব স্বপ্নের কথা বলেন, যেখানে ব্যক্তির স্বপ্নবিষয়ক অভিজ্ঞতাকে ছাপিয়ে মুখ্য হয়ে উঠেছে একই সাপেক্ষে সমাজের মানুষদের  চিন্তাগত সহাবস্থানের শিল্পিত প্রকাশ। পরবর্তীতে যা পাঠকের মনে এমনসব দৃশ্যপটের বিস্তৃত রূপ তৈরি করে, এমনসব দৃশ্যাতীত জগতের সন্ধান দেয়, যার সন্ধান আদতে আমরা কেউই পাইনা!

কিন্তু লেখক মনে হয় এগুলো নিয়ে বিস্তৃত কোনো কাজ করতে চাননি। তাই হয়তো উপন্যাসটি যে প্রেক্ষপটে লেখা তার সামগ্রিক কোনো চিত্র পাঠ শেষে আমাদের সামনে ভেসে উঠে না। যদিও প্রতীকী আবহে একটা সময়ের নানা প্রসঙ্গ হাজিরা দেয় মাঝে মাঝে। তারপরও যে ভাষাভঙ্গিতে তিনি পর্বগুলো রচনা করেছেন তা পাঠকের প্রেমবিষয়ক অনুভূতিকে গভীরভাবে স্পর্শ করবে।

সবশেষে, এই উপন্যাস পড়ে মনে হয়েছে মানবস্বভাব, মানবজীবন ও সমাজ নিয়ে লেখক আসলে এক টুকরো বাংলাদেশকেই নির্মাণ করতে চেয়েছেন!

উল্লেখ্য ‘গোসলের পুকুরসমূহ’ উপন্যাসে ‘পুকুর’ সময়ের সমার্থক।

বই সম্পর্কে~
নাম — গোসলের পুকুরসমূহ
লেখক — মেহেদী উল্লাহ
প্রচ্ছদ — ধ্রুব এষ
প্রকাশক — ঐতিহ্য
প্রচ্ছদ মূল্য — ১৭৫৳

Tuesday, 14 May 2019

ইনতেজার হুসেইনের শ্রেষ্ঠগল্প


[১]
যে বইটা কিছুক্ষণ আগে শেষ করেছি, সেটা আরো অনেক আগে শেষ হবার কথা ছিল । কিন্তু শেষ হয় নি । মাঝে মাঝে পাঠ থামাতে হয়েছে আমার । আর সেটা সঙ্গত কারণেই । কারণটি উল্লেখ করবার আগে এই বই নিয়ে দু'টি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি । কেননা আমার পরবর্তী কথাগুলোর সাথে তাদের একট‍া সম্পর্ক আছে ।

প্রথমত, এই বইয়ের গল্পগুলো সহজপাচ্য নয় । যে কেউ এই গল্পগুলো পড়ে তৃপ্তি পাবে না । মোদ্দাকথা বাংলাদেশি পাঠকেরা যে ধরণের গল্প পড়তে অভ্যস্ত এই গল্পগ্রন্থের গল্পগুলো নানাদিক দিয়ে তার থেকে ভিন্নতর । দ্বিতীয়ত, এটি একটি অনুবাদ বই । অনুবাদক কর্তৃক অনূদিত হয়ে যে ভাষিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এইপর্যন্ত এসেছে; সেই পরিবর্তনটুকু বুঝে উঠবার মতো মননশীল পাঠচর্চা আমাদের দেশে গড়ে উঠেনি ।
উল্লেখ্য, এখানে মোটাদাগে মধ্যবিত্ত পাঠকদের কথা বলা হচ্ছে । 

এবার এই বই নিয়ে আমার পাঠবিষয়ক কিছু ধারণার কথা বলি । সঙ্গত কারণটি সম্ভবত তার মধ্যে নিহিত আছে ।

[২]
ইনতেজার হুসেইনের গল্পের বিষয়বস্তু অভিনব, বর্ণনাভঙ্গি অনেকটা সাধারণ হলেও তাঁর নির্মাণশৈলী বৈশিষ্ট্যপূর্ণ । তাঁর গল্প পড়ে প্রথমবারেই কেউ পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারবে কিনা কিম্বা আদৌ কারোপক্ষে পুরোপুরি বুঝে উঠা সম্ভব কিনা এমন প্রশ্নে কোনো পাঠকই হয়তো ইতিবাচক উত্তর দিতে পারবেন না । 

তাঁর গল্প বুঝে উঠাটা আসলেই কষ্টসাধ্য । এই বুঝে উঠাটাও আবার সময় সাপেক্ষ ব্যাপার । তাই কোনো পাঠক যদি এই দাবী করেন যে, তিনি প্রথম পাঠেই উম্মোচন করে ফেলেছেন ইনতেজার হুসেইনের গল্পজগৎকে ; এক্ষেত্রে আমাদের জন্য সেটা একরকম আশ্চর্যজনক ঘটনায় হবে! বলতে দ্বিধা নেই যে আমি নিজেও তাঁর সব গল্প বুঝিনি । এক পর্যায়ে এসে মনে হয়েছে গল্পগুলো বুঝে উঠার মতো প্রাপ্তমনস্ক হয়তো এখনো হইনি । 

তারপর হঠাৎ গল্পগুলোতে এমনভাবে ডুবে যায় যে; মনে হলো, যেন পুরোটা সময় জুড়ে কোনো এক অদৃশ্য শক্তি এক নাগাড়ে আমাকে দিয়ে গল্পগুলো পড়িয়ে নিয়েছে!

[৩]
দেশভাগের ফলে শিকড়চ্যুত মানুষের তীব্র যন্ত্রণা আর বেঁচে থাকার তীব্র আকুলতা ধরা পড়েছে 'ভারতের চিঠি' গল্পে। 
দেশভাগের ঘটনা এবং অভিজ্ঞতা একজন বাস্তুচ্যুত মানুষের মনে কিরূপ প্রভাব ফেলে এবং একইসাথে তার বিপর্যয়জনিত সমস্যাগুলো কেমন? তা অসাধারণ কুশলতায় তুলে ধরেছেন লেখক এই গল্পটিতে। 
আর দেশত্যাগের ফলে একজন মানুষ  শুধুমাত্র যে তার পৈতৃক এক খন্ড জমি হারায়, একটি বাড়ি হারায় তাই নয়, একইসাথে সে হারায় তার জন্ম-জন্মান্তরের স্মৃতি ও সম্পর্ক, হারায় পূর্বপুরুষদের পদচিহ্ন। 
গল্পটিতে এসব মর্মান্তিক যন্ত্রণার কথাই ফুটে উঠেছে লেখকের নিজস্ব গদ্যভঙ্গিতে । 

মানুষের জীবনের, চিন্তার বিপুল রহস্যময়তাকে এক অদ্ভুত জটিল প্রক্রিয়ায় উম্মোচন করেছেন লেখক 'হলুদ কুকুর' গল্পটিতে। গল্পের হলুদ কুকুরটির ধারণাগত কোনো ব্যাখ্যা কি আদৌ করা সম্ভব?  এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়াটা আমার মতো পাঠকের জন্য বিব্রতকর  বৈকি। তারপরও হলুদ কুকুর আমাদেরকে ভাবতে বাধ্য করে!

'সহযাত্রী' গল্পটির কেন্দ্রীয় চরিত্রটির কোনো নাম নেই । ভুল পথে ভ্রমন করতে থাকা নামহীন এই যাত্রীর সাথে পাঠক তার পথযাত্রার সঙ্গী হলেও শেষপর্যন্ত  ঐ যাত্রীর মতো পাঠকেরও কোনো স্টপেজে নামা সম্ভব হয় না । উদ্ভ্রান্ত ঐ যাত্রীর মতো আমরা পাঠকেরাও শুধু অবলোকন করতে থাকি সময়ের আবর্তে ঘু্র্ণায়মান সেইসব মানুষদের মুখচ্ছবি যারা একটা সময়কালকে নিজেদের সঙ্গে নিয়ে নানাভাবে পথভোলা মানুষের জীবনের অংশ হয়ে উঠে! 

'আফসোসের শহর' গল্পে ভুলে যাওয়া ইতিহাসের চেতনাগত অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে স্মৃতিচারণ করতে থাকা তিনজন মৃতের পারস্পরিক সংলাপ আমাদের ইতিহাসের অনেক অনুষঙ্গকে স্মরণ করিয়ে দেয় । 

'ঘুম' গল্পে যুদ্ধ ফেরত সৈনিকের জবানিতে যুদ্ধকালীন নির্দয় সময়ের পাঠ নিতে গিয়ে গল্পের চরিত্ররা ক্লান্ত-অবসাগ্রস্থ সৈনিকটির মুখে বিস্মৃতির কবলে পড়া যে ঘটনার কথা জানতে পারে তা শেষপর্যন্ত যে চেতনাহীন অভিজ্ঞতায় পর্যবসিত হয়েছে গল্পের শেষে এসে সেটা আবিষ্কার করতে আমাদের তেমন অসুবিধা হয় না ।

'শেষ মানুষ' ও 'কানা দাজ্জাল' গল্প দু'টিকে উন্মোচন করতে না পারার ব্যর্থতাকে আমি আমার পাঠসীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখার চেষ্টা করেছি । তারপরও এতসব বৈচিত্র্যপূর্ণ বিষয়ের যে অসামান্য সমন্বয় ঘটিয়েছেন লেখক এই দুই গল্পে, তা লেখকের স্বাতন্ত্র্যতা ও নিজস্ব প্রবণতা হিসেবে ধরে নিতে সমস্যা হয় না ।

[৪]
এই বইয়ের গল্পগুলোতে সব কথা বলে দেওয়া নেয়, অনেক বিষয়ই লেখক ছেড়ে দিয়েছেন পাঠকের জন্য । পাঠকভেদে যদিও এই বুঝায় তারতম্য ঘটবে । তারপরও পাঠশেষে গল্পের মৌলিক আবেদন শেষপর্যন্ত একই থাকবে বলে আশা করা যায় । বিশেষ করে যেখানে গল্পের বিষয়বস্তু হিসেবে উপস্থিত আছে দেশভাগ, স্বাধীনতা আর ধর্ম ও রাজনীতির রক্তাক্ত ইতিহাসের বহুমাত্রিক বয়ান ।

ইনতেজার যে ভাষা, সংলাপ ব্যবহার করে তাঁর গল্পগুলোকে হাজির করেছেন, তা আমাদের তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলোর প্রতি প্রচন্ড অাগ্রহী করে তুলে ; একইসাথে তিনি তাঁর গল্পে যে আবহ তৈরি করেছেন এবং যেভাবে প্রতীক, উপমা ও মিথের ব্যবহার করেছেন তা যুগপৎভাবে তাঁর সমস্ত সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে  আমাদের যথেষ্ট কৌতুহলী করে তুলে ।


বই সম্পর্কে ~
নাম - ইনতেজার হুসেইনের শ্রেষ্ঠগল্প
অনুবাদ - সালেহ ফুয়াদ
প্রচ্ছদ - ধ্রুব এষ
প্রকাশক - ঐতিহ্য
মূল্য - ১৫০ টাকা

Sunday, 12 May 2019

একটি শোক সংবাদ


সাব্বির জাদিদের গল্পগ্রন্থ 'একটি শোক সংবাদ' সম্প্রতি আমার এক নতুনতর পাঠ-অভিজ্ঞতা । বিষয়বস্তু সাপেক্ষে গ্রন্থভূক্ত প্রতিটি গল্পই ছিল চমকপ্রদ । এসব গল্পে জনজীবনের অচ্যুত দিকগুলি উম্মোচন করার পাশাপাশি লেখক আলো ফেলেছেন এর সাথে জড়িয়ে থাকা সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রচলিত সব নিয়ম-নীতি-রীতি-রেওয়াজের উপরও । যা পাঠকদের নিত্যনৈমত্তিক জীবন-পদ্ধতির বাইরে গিয়ে  নতুন করে ভাবতে শেখায় ।
গল্পগুলোর বৈশিষ্ট্যপূর্ণ কতক আখ্যান শুধুমাত্র এর ব্যতিক্রমধর্মীতার জন্য পাঠকের আলাদা মনোযোগের দাবিদার ।
একইসাথে কিছু গল্পের পরিণতি এতই নাটকীয় যে, প্রাপ্তমনস্ক পাঠকরা হয়তো কিছুটা দ্বিধান্বিতভাবে এর আকস্মিকতার কথা স্বীকার করবেন, কিন্তু সাধারণ পাঠকমাত্রই  সেইসব আকস্মিকতায় তীব্রভাবে আলোড়িত হবেন ।

গল্পপ্রসঙ্গে...
সাব্বির জাদিদের গল্পগুলোর ভাষা সহজ-সরল প্রাণবন্ত । তাঁর গল্পের নির্মাণশৈলী ও বর্ণনাভঙ্গি আকর্ষণীয় । যে কারণে গল্পগুলোর আঙ্গিকে, বিষয়ে বিচিত্রতা থাকলেও তা পাঠকের কাছে জটিলতর ঠেকে না ।
বইটা পড়া শুরু করেছিলাম শেষের দিক থেকে, সর্বশেষ গল্প 'পড়শি' দিয়ে ।
গল্পটি জীবনের সায়হ্নে এসে মূমুর্ষ অবস্থায় স্মৃতিচারণ করতে থাকা এক হতভাগ্য বৃদ্ধের । যে কিনা একদিকে পোড় খাওয়া জীবনের সর্বশেষ সংকটময় পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে থাকে, অন্যদিকে হন্যে হয়ে স্মৃতি হাতড়ে কি যেন খুঁজতে থাকে । এমন সময় হঠাৎ অাশ্চর্য হয়ে দেখি যে, তার মধ্যে ধর্মবোধ-ধর্মানুভূতি তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠছে । ফলস্বরূপ নাজুক পরিস্থিতিতে আমরা এমন সহায়-সম্বলহীন একজন বৃদ্ধকে দেখি, যে কিনা তার আত্মিক প্রশান্তিকে ত্বরান্বিত করছে এই ভেবে যে, সে মসজিদের পড়শি হওয়ার কারণে মৃত্যুকালে হলেও আল্লাহর কালাম শুনে যেতে প‍ারছে!
মানুষের জীবনে আধ্যাত্মিক ধ্যান-ধারণা কতোটা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্ট হিসেবে কাজ করে এবং এর মনস্তত্বাত্ত্বিক দিকটি যে কতোটা গভীর 'পড়শি' গল্পটি পড়ে তার কিছুটা হলেও অনুমান করা সম্ভব।

'জাতক ও জন্মভূমি' এবং 'যতিচিহ্ন' গল্প দু'টির পরিণিতি গ্রন্থভূক্ত বাকী গল্পগুলির পরিণতির চেয়ে ভিন্ন । সামনে ঠিক কি হবে সেটা আগে থেকে বুঝা না গেলেও এমনকি গল্পের কাহিনির প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ আলাদা হওয়া সত্ত্বেও গল্প দু'টির  পরিণতির আকস্মিকতার দিক দিয়ে কিছুটা মিল খুঁজে পাওয়া যায় । যেমন - 'জাতক ও জন্মভূমি' গল্পে পোয়াতি নাসরিনকে নিয়ে তার পরিবারের অস্থিরতা, পারিপার্শ্বিক সংকটময় অবস্থা ও সর্বোপরি রতনের মা'র আঁতুড়ঘরে অসফল হওয়াটার সাথে নবজাতকের জরায়ুর পর্দা খামচে ধরে থাকার সম্পর্কটা যেমন অলৌকিক ও আশ্চর্যজনক ছিল, ঠিক তেমনি ' যতিচিহ্ন' গল্পের নায়ক (নাকি খলনায়ক) বাদল ওরফে বদু তার সাম্প্রদায়িক বিশ্বাস-সংস্কার-ধারণা হেতু হঠাৎ  উদ্ভূত  এক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ধর্মালয়ে বিপুল প্রভাব-প্রতিপত্তি সাথে নিয়ে  যে তান্ডব চালায় তার সাথে শেষ মুহুর্তে পল্টু কর্তৃক প্রতিমা ভাঙার প্রাক্কালে বদুর চোখে সেই প্রতিমার মুখাবয়বে তার প্রেয়সী ফাতেমার মুখচ্ছবি ভেসে উঠাটা একই সাথে আমাদের জন্য সমান অলৌকিক ও আশ্চর্যজনক ছিল ।
লৌকিক-অলৌকিকতার এই সমান্তরালে চলাটা যেনবা আমাদের চোখের সামনেই!

'দূরত্ব' গল্পে দুইজন ঘনিষ্ঠবন্ধুর মাঝে তাদের মাদ্রাসার শিক্ষাজীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সংকীর্ণতার কারণে পরবর্তীতে যে শারীরিক ও মানসিক দূরত্ব সৃষ্টি হয়, তারই আখ্যান বর্ণিত হয়েছে ।  যে আখ্যানে রয়েছে ধর্মীয় মতে আপাত ভিন্নতা থাকার কারণে সৃষ্ট বৃহত্তর গোষ্ঠীভিত্তিক মতাদর্শিক নানাবিধ সমস্যার কথা । যেগুলো নিতান্তই  হাস্যকর !

'দোলায়িত জীবনের গান' ও ' একটি পুঁজিবাদী গল্প' তে প্রকাশ পেয়েছে যথাক্রমে নাগরিক জীবনের বিপুল রহস্যময়তা, প্রাত্যহিক জীবনের অনাহুত বিড়ম্বনা আর শ্রেণীবৈষম্যের কারণে সৃষ্টি হওয়া ভেদাভেদ এক রাখালের মনে কিভাবে বিরূপ প্রভাব ফেলে তারই ইতিবৃত্ত ।
'সূর্য না উঠা জনপদের গল্প' তে অসাধারণ ইঙ্গিময়তায় সামাজিক-রাষ্ট্রিক এক কঠিন সত্যকে রূপায়ণ করেছেন লেখক তাঁর অসামান্য গদ্যভঙ্গিতে ।
 পাঠককে তিনি নিয়ে গেছেন বিপর্যয়গ্রস্থ এক পৃথিবীতে । যে পৃথিবীতে স্বপ্নঘোরগ্রস্থ মানুষেরা তাদের এই সংকটমুখর ক্লান্ত জীবনকে পাশ কাটিয়ে অনিন্দ্য সুন্দর এক স্বাভাবিক-মানবিক জীবন যাপন করতে চান ।
 অদ্ভূত কোমল-মায়াময় এক অনুভূতি হয়েছিল 'যখন এসেছিলে' গল্পটি পড়ে । মন্ত্রমুগ্ধের মতো এক নাগাড়ে পড়ে শেষ করি পুরো গল্পটা । এই গল্প বাস্তবতাকে ছাপিয়ে লেখকের গভীর আখাঙ্ক্ষাকে মূর্ত করে তুলেছে প্রশ্নহীনভাবে!
এই বইয়ের অন্যসব গল্পের তুলনায় 'কুত্তা' গল্পটিকে অসম্পূর্ণ মনে হয়েছে । গল্পটিতে গ্লানিময় জীবনের একটা চিত্র পাওয়া যায় যদিও । তারপরও  পড়ে তৃপ্তি পাইনি ।

বইয়ের নামগল্প 'একটি শোক সংবাদ' নিয়ে আলাদা একটা আগ্রহ ছিল । গল্পটিতে লেখক অন্যচোখে নির্মাণ করেছেন মৃত্যুবিষয়ক ধারণাকে । যা পড়ে ক্ষণিকের জন্য বিষাদগ্রস্থ হয়ে পড়ি ।

শেষকথা...
সমাজবাস্তবতার পাশাপাশি মানুষের বিচিত্র সব মনোভঙ্গি বহুমাত্রিকভাবে চিত্রিত হয়েছে এই বইয়ের গল্পগুলোতে । যাতে ক্রমশ দৃশ্যমান হয়েছে নানাবিধ সমস্যা-জর্জরিত তৃতীয় বিশ্বের একটি ক্ষুদ্রতম দেশের অন্ত্যজ মানুষদের ভাগ্যাহত, যন্ত্রণাদগ্ধ তীব্র সংকটময় বিপন্ন সব মনোভূবনের করুণ প্রতিচ্ছবি ।


বই সম্পর্কে ~ 
নাম - একটি শোক সংবাদ
লেখক - সাব্বির জাদিদ
প্রচ্ছদ - কাজী জুবাইর মাহমুদ
প্রকাশক - ঐতিহ্য
মূল্য - ১৫০ টাকা

Wednesday, 1 May 2019

আধো ঘুমে ক্যাস্ট্রোর সঙ্গে


পাঠের পূর্বে...
কয়েকদিন যাবৎ একটা বই পড়ব পড়ব বলে মনে মনে ঠিক করেছি । বইটার নাম 'আধো ঘুমে ক্যাস্ট্রোর সঙ্গে' । শাহাদুজ্জামানের ডকুফিকশন । লেখকের লেখার সঙ্গে আমার যে বোঝাপড়া ; তার থেকে ধারণা করি, এই বইটি ফিদেল ক্যাস্ট্রোকে কে নিয়ে লেখা কোন জীবনীমূলক উপন্যাস । লেখকের প্রকাশিত অন্যান্য উপন্যাসের বিষয়বস্তু সাপেক্ষে আশা করি আমার এই চিন্তা অমূলক নয় । উল্লেখ্য, ফিদেল ক্যাস্ট্রোর বর্ণাঢ্য বিপ্লবী জীবন সম্পর্কে আমার তেমন কোন জানাশোনা  কিম্বা পূর্বপাঠ নেই । সেদিক থেকে এই বইটি ক্যাস্ট্রোকে নিয়ে লেখা আমার পড়া প্রথম কোন বই । এটা ছাড়াও বইটি সংগ্রহ আরো একটি কারণ আছে । শাহাদুজ্জামানের এক সাক্ষাৎকার থেকে জানতে পারি, তাঁর লেখালেখি বামচিন্তাধারায় প্রভাবিত । সেই হিসেবে বোধকরি এই বই পড়ে তার চিন্তা পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা পাব । ইতোমধ্যে কয়েকটি ছোটগল্পে তার লেখালেখির এই দর্শন সম্পর্কে জানতে পেরেছি । যদিও সেটা বিচ্ছিন্নভাবে । যাইহোক,আশা করি পাঠটি তাৎপর্যপূর্ণ হবে!

মধ্যপাঠে...
বইটার মাঝে মাঝে এসে মনে হলো আমি যেটা জ‍নতে চাইছি সেটা এখনো আমাকে জানানো হয়নি । আমি যদিও ক্যাস্ট্রোর ছেলেবেলা নিয়ে তেমন আগ্রহী ছিলাম না । তারপরও কিউবার বিপ্লবের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে লেখক মারফত সেটা জানতে পেরেছি কিছুটা । 
কিউবার বিপ্লবের পটভূমি জানা না থাকার কারণে আমার জন্য তাই বইয়ের প্রথমার্ধ খুবই কৌতূহলোদ্দীপক ছিল । এবং ক্যাস্ট্রোর পারিপার্শ্বিক সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অবস্থা তার বিপ্লবী মানস গঠনে কিভাবে প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে, একইসাথে ফিকশনের ফর্ম অনুযায়ী জীবনের শেষ প্র‌ান্তে এসে ক্যাস্ট্রোর নিজের মুখে তার ছেলেবেলার কাহিনী শুনতে এবং সেইসময়কার তার সমাজবীক্ষণকে, জীবনবীক্ষণকে বুঝতে এই পর্যন্ত বেশ সহায়ক ছিল বইটি ।

পাঠশেষে...
'আধো ঘুমে ক্যাস্ট্রোর সঙ্গে' পাঠান্তে আমি যেসব বিষয় জেনেছি, তার মধ্যে হোসে মার্তি, সিয়েরা মিয়েস্ত্রা ও ল্যাফটেন্যান্ট পেড্রো, এই তিনটি নাম খুবই উজ্জ্বলভাবে আমার মনে দাগ কেটেছে ।
যদিও ক্যাস্ট্রোর ঐসব অভিযানের অভিজ্ঞতার বর্ণনা, যুদ্ধদিনের রোমাঞ্চকর স্মৃতিচারণমূলক বৈঠকি আলোচনাও সমান্তরালে দাগ উঠেছে মনে । তারপরও ঐ তিনটি নাম আলাদা আলাদাভাবে স্মৃতিতে বসে গেছে ।

হোসে মার্তি
কিউবার মানুষদের জন্য মার্তি এক বিরাট অনুপ্রেরণার নাম ।এই মার্তি-ই স্পেনের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম সশস্ত্র লড়াইয়ে নেমেছিলেন কিউবার হয়ে । যদিও পরাজিত হয়েছিলেন সেই যুদ্ধে । তারপরও তাঁর স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল, তাঁর যোগ্য উত্তরসূরীরা তাঁর কবিতাকে বুকে ধারণ করে কিউবাকে মুক্ত করেছিলেন পরবর্তীতে । মার্তির সেই বিখ্যাত কবিতাটি -
পাহাড়ের  ঢাল বেয়ে যেমন নেমে আসে পাথর
সত্যমত বাধা ঠেলে ঠেলে সে পৌঁছে যায় গন্তব্যে
কেউ হয়তো কখনো শ্লত করে দিতে পারে তার গতি
কিন্তু চিরতরে থামানো?
অসম্ভব । একেবারেই অসম্ভব 
এই কবিতাটি ক্যাস্ট্রো আদালতে দাঁড়িয়ে বিচারকের সামনে আবৃত্তি করেছিলেন ।

সিয়েরা মিয়েস্ত্রা
এই পাহাড়টির সাথে এবং এখানে বসবাসরত জনগোষ্ঠিটির সাথে ক্যাস্ট্রোর অনেক স্মৃতি আছে । যেগুলো বেশ রোমাঞ্চকর ।

ল্যাফটেনেন্ট পেড্রো
এই ল্যাফটেনেন্টই ক্যস্ট্রোকে নতুন জীবন দান করেছিলেন । তিনি না বাঁচালে ক্যাস্ট্রো নির্ঘাত বাতিস্তার সৈন্যদের হাতে মারা পড়তেন । কিউবার ইতিহাসও তখন অন্যভাবে লিখিত হতো ।

পুনশ্চ - পাঠশেষে একটা অতৃপ্তি শেষপর্যন্ত থেকেই গেছে । হয়তো বইটা নিয়ে আমার আগ্রহ আর প্রত্যশা আরো অনেক বেশি ছিল বলেই এমনটা হয়েছে ।

বই সম্পর্কে ~
নাম - আধো ঘুমে ক্যাস্ট্রোর সঙ্গে
লেখক - শাহাদুজ্জামান
প্রচ্ছদ - শিবু কুমার শীল
প্রকাশক - ঐতিহ্য
মূল্য - ১৪০ টাকা

Monday, 15 April 2019

পাঠচিন্তা

ক.
আমরা যখন কোনো বই পড়ি, তখন এক ধরণের চিন্তা আমাদের মধ্যে কাজ করে । ফিকশন, নন-ফিকশনের ক্ষেত্রে এই চিন্তা আলাদাভাবে কাজ করে যদিও ; তারপরও সেই চিন্তা ক্ষেত্র অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্নভাবে আমাদের চালিত করে এবং নানাভাবে আমাদের বাস্তব জীবনকে প্রভাবিত করে ।

খ.
আমরা যখন কোনো গল্প পড়ি তখন গল্পের চরিত্রের সাথে একাত্ম হয়েই পড়ি । কখনো কখনো আমরা পাঠের মাঝে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি গল্পের চরিত্র থেকে । লেখকসত্ত্বার সাথে পাঠকসত্ত্বার এই দ্বান্ধিক অবস্থানটি আমাদের জানান দেয় পাঠক হিসেবে আমাদের জানার সীমাকে, চিন্তার সামগ্রিক অবস্থানকে । মূলত এই কারণেই আমরা গল্প থেকে ছিটকে পড়ি । এই একই বিষয়টি লেখকের ক্ষেত্রেও সমানভাবে কার্যকর । অর্থাৎ স্বয়ং একজন লেখক এইসব পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই গল্পের চরিত্রকে দাঁড় করান নিজের সামনে । কেননা সবার একজন লেখককেই তার নিজের সৃষ্ট চরিত্রের সামনে দাঁড়াতে হয় । তাছাড়া পাঠককে ছাড়িয়ে যাওয়ার আগে চরিত্রটিকে তো স্বয়ং লেখককে ছাড়িয়ে যেতে হবে । তবেই তো চরিত্রটি ক্রমশ জীবন্ত হয়ে উঠবে । বেঁচে থাকবে হাজারো পাঠকের মাঝে ।
আমরা, পাঠকেরা তো সদা-সর্বদা নিজেদেরকেই খুঁজে বেড়াই গল্পের মাঝে, চরিত্রের মাঝে । নিরন্তর খুঁজে ফিরি আমাদের হারিয়ে যাওয়া চরিত্রকে,  আমাদের হারিয়ে যাওয়া সময়কে, স্বপ্নকে । কখনো কখনো খুঁজে পায় আর কখনো পায় না ।
তাই তো হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকি নিজেদেরকে, এক লেখকের গল্প থেকে অন্য লেখকের গল্পের মাঝে...

গ.
উপন্যাসের জগতটা ভিন্নতর ।
একজন ঔপন্যাসিক নানা আঙ্গিকে কোনো না কোনোভাবে আমাদের মহাকালের গর্ভে ঢুকিয়ে দেন । এবং একইসাথে অতীত-ইতিহাস, বর্তমান-ঘটমান আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দোলাচালে আমাদের পরিভ্রমণ করাতে থাকেন । আমরাও ঔপন্যাসিকের দেখানো পথে তার ভাব-চিন্তাকে,মতাদর্শিক কল্পনা-জল্পনাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা কাহিনীকে কিম্বা কখনো  কখনো চরিত্রকে আবিষ্কার-উদ্ভাবনে ব্যস্ত হয়ে পড়ি । অবচেতনে ।

ঘ.
প্রবন্ধপাঠের প্রকৃতি বিষয়বস্তু সাপেক্ষে একেক জনের একেক রকম হলেও মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষেত্রে প্রবন্ধের আবেদন মোটের উপর সকল পাঠকের কাছে একই রকম বলে মনে হয় । গল্প-উপন্যাস পাঠের মাঝে পাঠক কোনো কারণে পাঠ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে কিম্বা খেই হারিয়ে ফেললে পরবর্তিতে তার পাঠ চালিয়ে নিতে তেমন অসুবিধা হয় না । কেননা লেখক কাহিনী ও চরিত্রের মাঝে পারস্পরিক যে যোগসূত্র তৈরি করে দেন তা থেকে বিস্মৃত হওয়া অংশকে খুঁজে পেতে একজন পাঠকের তেমন বেগ পেতে হয় না ।

ঙ.
কবি ও কবিতা এই শব্দদ্বয় নিয়ে শাব্দিক-ভাষিক ও ভাবমূর্তিগত একটা ধোঁয়াশা ছোটবেলা থেকেই পাঠকমনে হাজির থাকে । ফলত ছোটবেলা থেকে পাঠ্যবইয়ের কবিতা থেকে কবিতা বুঝবার এবং তার ঐশ্বরিক সৌন্দর্য্য অবলোকন করবার যে দায় থাকবার কথা একজন কবিতার পাঠকের, পরীক্ষা ও এর শিখন কিম্বা পঠনপদ্ধতিসহ আরো কিছু বিবিধ হঠকারিতার কারণে সেই দায় আর কোনোভাবেই অবশিষ্ট থাকে বলে মনে হয় না আমার মতো পাঠকদের । তারপরও কিছু কিছু কবির কবিতা শৈশবে-কৈশোরের  অমলিন পবিত্র সব স্মৃতির মতো টানে ।
কিছু কিছু কবিতা মুখস্থ করে শুধু আবৃত্তি করতে ইচ্ছা করে । ইচ্ছা করে ডুব দিয়ে দিয়ে হারিয়ে যাই প্রতিটা শব্দের মাঝে । অনন্ত আকাশের মাঝে, শরতের আকাশের প্রতিচ্ছবি হয়ে থাকা ঐ নদীটার বুকের মধ্য দিয়ে!

চ.
আমরা যা-ই পড়ি না কেন, দিনশেষে আদতে যেটা পড়েছি সেটা থেকে কোনো না কোনোভাবে আমরা মূলত আমাদের চিন্তার রসদ যোগায় । তাই অবসরে সেসব বিষয় নিয়েই বেশি ভাবি যেসব বিষয় পড়েছি । আর আমরা যদি কোনো কাজে ব্যস্ত থাকি তাহলে যা পড়েছি তা আমাদের তাড়িত করে,অবচেতনে নানাভাবে আমাদের উদ্দীপ্ত করে। এবং অবশ্যই আমাদের পঠন-পাঠনকে প্রসারিত করতে, চিন্তার বিস্তার ঘটাতে এই পড়া ব্যাপক ভূমিকা পালন করে ।

রচনাকাল - ০৬/০৪/'১৮ইং - ০৯/০৪/'১৮ইং

বিবিধ অভাব : লিওনার্দো লালন লাঁকা

‘চিত্রকলা, দর্শন, সংগীত, ভাষা, গ্রন্থপাঠ ও মঞ্চনাটক নিয়ে মোট ১৬টি প্রবন্ধের এক অনবদ্য সংকলন এটি। প্রত্যেক লেখাতেই পাঠক নতুন ভাবনার মুখোমুখি...